জন্মনিবন্ধন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে ভিনদেশি নাগরিকদের নাগরিকত্ব দেয়ার অভিযোগ উঠেছে নওগাঁর একটি চক্রের বিরুদ্ধে। স্থানীয়রা বলছেন, ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাইয়ে দিতে নিয়ামতপুরের আলমগীর হোসেন নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে কাজ করে আসছে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সচিবসহ কয়েক সদস্য।
এই প্রক্রিয়ায় সম্প্রতি হালনাগাদ ভোটার তালিকায় লালমুন খাতুন নামে এক নারীর নাম যুক্ত হওয়ার প্রমাণ মিলেছে! এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে, নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন বাহাদুরপুরের ইউপি সচিব জাহাঙ্গীর আলম ও প্যানেল চেয়ারম্যান ওয়াজেদ আলীর সহযোগিতায় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেয়া হয় লালমুনের জন্মসনদ। আর এই জন্মসনদ দিয়েই মেলে তার জাতীয় পরিচয়পত্র!
স্থানীয়রা জানায়, গত কয়েক বছর ধরে আকন্দপুর গ্রামে আলমগীরের বাড়িতে দুই সন্তানসহ বসবাস করছেন লালমুন খাতুন। গ্রামবাসীর কাছে শুরুতে খালাতো বোন হিসেবে পরিচয় দিলেও আলমগীর হোসেনের স্ত্রী হিসেবেই জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন লালমুন! সচিব এবং ইউনিয়ন পরিষদের কয়েক সদস্যসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পাইয়ে দেয়ার এই কাজ করে আসছে বলেও দাবি গ্রামবাসীর।
এর আগেও আলমগীর হোসেন নিজের বাড়িতে রেখে একই প্রক্রিয়ায় জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে দিয়েছেন আরেক নারীর—এমন অভিযোগও রয়েছে।
ভোটার তালিকায় নাম যুক্ত করতে আলমগীরের নেতৃত্বে গ্রামে গ্রামে কাজ করেন তার নিজের লোকজন। সবশেষ ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে বাহাদুরপুর ইউনিয়নের আকন্দপুর গ্রামে তথ্য সংগ্রহ করেন আলমগীর হোসেনের চাচাতো ভাই মাসুদ রানা নামে এক স্কুল শিক্ষক। তার মাধ্যমেই তালিকায় নাম যুক্ত করা হয় লালমুন খাতুনের। এ বিষয়ে জানতে তার স্কুলে খোঁজ করলে জানা যায়, মেয়ের চিকিৎসা করাতে মাসুদ নিজেও অবস্থান করছেন ভারতে!
২৪’র গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আলমগীর হোসেন নিজেকে বিএনপি নেতা দাবি করলেও স্থানীয় বিএনপি নেতারা বলছে ভিন্ন কথা। আর অনিয়ম-দুর্নীতি করে বিপুল সম্পদ অর্জনসহ ইউপি সচিবের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের কথাও জানান কৃষক দলের এই নেতা!
অন্যদিকে, বাহাদুরপুর ইউনিয়ন পরিষদ সচিব জাহাঙ্গীর আলম ঘটনার সত্যতা নেই দাবি করে এ বিষয়ে ক্যামেরার সামনে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে ক্যামেরার আড়ালে এলাকাবাসীদের নিয়ে করেছেন আপত্তিকর মন্তব্য!
আর গণমাধ্যমকর্মীদের এড়িয়ে যেতে তড়িঘড়ি করে পরিষদ চত্বর ত্যাগ করেন প্যানেল চেয়ারম্যান ওয়াজেদ আলী!
জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা ধরে লালমুন খাতুনের খোঁজে আলমগীর হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর দরজা খুললেও ক্যামেরা আর সাংবাদিক দেখে এক ঝলক দেখা দিয়েই দরজা বন্ধ করে দেন লালমুন! বার বার ডেকেও কোনো সাড়া মেলেনি আর।
আর অভিযোগ অস্বীকার করে ভারতীয় নাগরিক নয়, লালমুন খাতুনকে প্রথমে নিজের স্ত্রী ও পরে খালাতো বোন দাবি করলেও নিজের শ্বশুরবাড়ি—অর্থাৎ লালমুন খাতুনের বাবার বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে ফোন কেটে দেন অভিযুক্ত আলমগীর হোসেন।
হালনাগাদ ভোটার তালিকায় ভারতীয় নাগরিক হিসেবে লালমুন খাতুনের নাম যুক্ত হওয়ার অভিযোগ মিলেছে বলে জানায় নির্বাচন কমিশন। আর অন্য দেশের নাগরিকদের জন্মসনদ দেয়ার বিষয়ে কোনো অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
কেবল লালমুন নয়, হঠাৎ করেই গ্রামে আরও কয়েকজন অচেনা মানুষ বসবাস শুরু করেছে বলে অভিযোগ তুলেছে আকন্দপুরের মানুষ। সীমান্তবর্তী আশপাশের গ্রামগুলোতেও মিলছে এমন অভিযোগ। অনুসন্ধান বলছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় টাকার বিনিময়ে ভারতীয় নাগরিকদের জন্মসনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র পাইয়ে দিয়ে এভাবে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করছে একাধিক চক্র। এমন অবৈধ কর্মকাণ্ডকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি বড় ধরণের হুমকি মনে করছে, নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
ভিডিও লিংক : https://www.youtube.com/watch?v=LCs7reP3y8Y
আরও পড়ুন:








