ভারতের মহারাষ্ট্রে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রশাসনিক এই সংস্কারের আড়ালে সংখ্যালঘু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ভোটাধিকার হরণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে। সেইসঙ্গে মোদি সরকারের নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন।
সাবার ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে বাদের চিত্র
সাবার ইনস্টিটিউটের প্রাথমিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য। পরিসংখ্যান বলছে, মহারাষ্ট্রজুড়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে মোট ২ কোটি ৬ লাখ ৮০ হাজার ভোটারের নাম। এর মধ্যে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয়, বাদ পড়া এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৩০ লাখ ২০ হাজার ১৭৩ জনই মুসলিম নামধারী, যা মোট বাদ পড়া ভোটারের ১৪.৬ শতাংশ। অথচ সাম্প্রতিক আদমশুমারি অনুযায়ী, মহারাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যায় মুসলিমদের হার আনুমানিক ১২.১ শতাংশ। অর্থাৎ, রাজ্যের মোট জনসংখ্যার আনুপাতিক হারের তুলনায় ভোটার তালিকা থেকে নাম ছাঁটাইয়ের শিকার হওয়া মুসলিমদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
মুম্বাইয়ে ভয়াবহ ব্যবধান
রাজ্যজুড়ে এই ব্যবধান স্পষ্ট হলেও, ভারতের বাণিজ্যনগরী মুম্বাইয়ে চিত্র আরও ভয়াবহ। সাবার ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, মুম্বাইয়ে মোট বাদ পড়া ভোটারদের ২১.৩ শতাংশই মুসলিম নামধারী। আর মহারাষ্ট্রের অন্যান্য অঞ্চলে এই হার ১৩.২ শতাংশ।
পদবিভিত্তিক বাদের তালিকা
ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া পদবিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি বাদ পড়েছে শেখ পদবিধারীরা। রাজ্যটির ভোটার তালিকা থেকে এক এই পদবিরই ৭ লাখ ৫৩ হাজার ৯৭৮ জনের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। পদবিভিত্তিক এই তালিকায় শেখদের ঠিক পরেই রয়েছে পাটিল পদবি, যাদের ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৫২৬ জনের নাম বাদ পড়েছে। তালিকায় এরপর রয়েছে খান পদবির ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৬৪৯ জন, যাদব পদবির ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৭৯৬ জন এবং পাওয়ার পদবির ২ লাখ ৭৪ হাজার ৬০৭ জন ভোটারের নাম। তবে শেখ পদবিধারীদের নাম বাদ দেয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অস্পষ্টতা এবং বৈষম্যমূলক আচরণের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কারণ না দেখিয়ে বাদ দেওয়ার অভিযোগ
প্রতিবেদনে আরও প্রকাশ পেয়েছে, বাদ পড়া শেখ পদবিধারীদের ৮৮ শতাংশের ক্ষেত্রেই মৃত্যুর মতো কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ দেখানো হয়নি। এর পরিবর্তে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে গেছে, অনুপস্থিত, তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না অথবা তারা আগেই অন্য কোথাও ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত রয়েছে।
মুম্বাই ও নারী ভোটারদের চিত্র
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া শেখ পদবিধারীদের প্রায় ৩০ শতাংশই মুম্বাইয়ের মূল বাসিন্দা। এদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ নারী ভোটার। শুধু তাই নয়, মহারাষ্ট্রের ২৮৮টি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিটিতেই এই পদবির ভোটারদের নাম ছাঁটাই করা হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়ার ঘটনা ঘটেছে মুমব্রা-কালওয়া বিধানসভা কেন্দ্রে।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, মোদি সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রশাসনিক এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থায় এমন নীতিগত জটিলতা তৈরি করে কি আসলে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে এবং তাদের ভোটাধিকার সংকুচিত করা হচ্ছে? এমন নানা প্রশ্নে এখন উত্তপ্ত ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন।
আরও পড়ুন:







