প্রতিবেশীর মুখে মিষ্টি কথার বুলি, আর অন্তরে সুদূর প্রসারী আগ্রাসনের নকশা। বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের উগ্র রাজনৈতিক মহলের পুরোনো সেই চিরচেনা আগ্রাসী হুংকার কি তবে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে?
ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের নতুন সরকার আর দিল্লির সেই অন্ধ আনুগত্যের নীতিতে চলছে না। আর ঠিক এই কারণেই দিশেহারা হয়ে বিভিন্ন সময় একের পর এক উস্কানিমূলক ও সার্বভৌমত্ববিরোধী মন্তব্য করে চলেছে ভারতীয় নেতারা।
নিশিকান্ত দুবের উদ্ভট দাবি
ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির ঝাড়খণ্ডের সাংসদ নিশিকান্ত দুবে, সম্প্রতি ভারতীয় এক সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ভারতের এখন বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর, নোয়াখালী এবং সিলেট অঞ্চলও পুনরুদ্ধার করা উচিত।
তার এই উদ্ভট যুক্তির পেছনে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের একপাক্ষিক ইতিহাস। নিশিকান্ত দুবের দাবি, তৎকালীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু নাকি জোর করে এসব অঞ্চল হস্তান্তর করেছিলেন। এমনকি ১৯৪৬ সালে নেহরুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া এবং মুসলিম লীগকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই বিজেপি সাংসদ।
শুধু তাই নয়, উত্তর-পূর্ব ভারতের তথাকথিত অনুন্নয়নের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর হাতছাড়া হওয়াকেই দায়ী করেছেন তিনি। অর্থাৎ, স্পষ্টতই বাংলাদেশের সার্বভৌম ভূখণ্ডের ওপর লোলুপ দৃষ্টি দেয়ার পুরোনো মানসিকতা এখন প্রকাশ্যেই ফুঁসে উঠছে।
অন্যান্য বিজেপি নেতাদের হুমকি
শুধু ঝাড়খণ্ডের সাংসদই নন, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও বসে নেই। এর আগে কলকাতার এক সংবাদ সম্মেলনে, তিনি সরাসরি হুমকি দিয়েছেন, বাংলাদেশের যশোর ও খুলনা অঞ্চলকে নাকি ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার পতনের পরপরই পশ্চিমবঙ্গের আরেক বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী পেট্রাপোল স্থলবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া এবং বাংলাদেশমুখী আলু-পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধেরও হুংকার ছেড়েছিলেন।
হুমকির পরিণতিতে ভারতের ক্ষতি
কিন্তু কথায় বলে না, খুদ নিজেই চড়ে বাঁশ, আপন কাঁধে কাওড়া গাছ! বাংলাদেশের ওপর খবরদারি ফলাতে গিয়ে বাস্তবে কী দেখল ভারত? পেট্রাপোল বন্দর বন্ধ কিংবা নিত্যপণ্য আটকে রাখার এসব হুমকির পরিণতিতে বাংলাদেশের চেয়ে বড় ক্ষতির মুখে তো পড়েছে খোদ ভারতেরই কৃষক, ব্যবসায়ী আর সাধারণ উৎপাদকরা।
চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসা ও পর্যটন ভিসা সীমিত করার হঠকারী সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েছে ভারতের স্থানীয় পর্যটন ও চিকিৎসা খাত।
আর, গত বছর ঈদুল আজহার সময় বাংলাদেশ যখন ভারতের গরু আমদানি বন্ধ করে দিল, তখন সর্বস্বান্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল ভারতীয় গরু ব্যবসায়ীদের।
নরেন্দ্র মোদি সরকারের মন্ত্রী-নেতারা যখনই কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে চাপে ফেলার চেষ্টা করেছে, বুমেরাং হয়ে সেই ধাক্কা উল্টো যেয়ে আছড়ে পড়েছে ভারতের নিজেদের অর্থনীতির ওপরই।
বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ও জনগণের প্রতিক্রিয়া
ভারতের এই উগ্র ও আধিপত্যবাদী হুমকির প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে দেশের তরুণ সমাজ ও উদীয়মান রাজনৈতিক নেতৃত্ব। ভারতের এসব আগ্রাসী মনোভাবের জবাবে স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে দমিয়ে রাখার দিন শেষ। দরকার হলে পালটা ভারতের সেভেন সিস্টার্স বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে আলাদা করে ফেলার হুঁশিয়ারিও এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
তবে, সব ছাপিয়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে দেশের মাঠ পর্যায়ে। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া এই নতুন বাংলাদেশ এখন আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি সজাগ ও শক্তিশালী। সীমান্তে এখন আর আগের মতো একতরফা আগ্রাসনের সুযোগ নেই; বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় জনতাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সীমান্ত পাহাড়া দিচ্ছে। বিএসএফের যেকোনো উস্কানি বা আগ্রাসনের জবাব দিতে এখন আর শুধু বিজিবি লাগছে না, স্থানীয় সাহসী জনতাই তাদের দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে প্রতিহত করছে।
ওপার থেকে যদি বাংলাদেশের কাউকে ধরে নিয়ে যাওয়ার দুঃসাহস দেখানো হয়, তবে এপার থেকেও বাংলাদেশি স্থানীয়রা দুইজনকে ধরে নিয়ে আসার নজির স্থাপন করেছে। ওপার থেকে যদি একটি গুলিও ছোড়া হয়, তবে এপার থেকে গর্জে ওঠে দশটি গুলি।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এই চরম টানাপোড়েনের সময়ে যশোর-খুলনা কিংবা সিলেট-চট্টগ্রাম নিয়ে এই নতুন হুমকি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাসের দেওয়াল তুললেও, দেশের মানুষ এখন আর দিল্লির কোনো হুমকিকেই পরোয়া করে না বলেই বিভিন্ন ঘটনায় প্রতক্ষ হয়েছে। ভারতের সকল অনৈতিক চাপ, আগ্রাসী হুংকার এবং একতরফা সুযোগ-সুবিধা চিরতরে রুখে দেয়ার বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছে এ দেশের ছাত্র-জনতা।
পারস্পরিক সমতা, মর্যাদা এবং পূর্ণ ন্যায়বিচারের ভিত্তিতেই কেবল প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক হতে পারে, এর কমে একচুলও ছাড় দিতে নারাজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মানুষ।
আরও পড়ুন:







