শুক্রবার

৬ নভেম্বর, ২০২৬ ২২ কার্তিক, ১৪৩৩

রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায়; ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় লাখো রোহিঙ্গা মুসলিম

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৫ নভেম্বর, ২০২৬ ২৩:৫০

শেয়ার

রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায়; ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় লাখো রোহিঙ্গা মুসলিম
ছবি সংগৃহীত

নিজের দেশেই পরবাসী, নিজের মুসলিম পরিচয়েই নিপীড়িত। নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া, চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, হত্যা, ধর্ষণ আর বাড়িঘরে আগুন, এমন ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী। ২০১৭ সালে দেশটির রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর অভিযানে প্রাণ হারান হাজারো রোহিঙ্গা মুসলিম। জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আসেন সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম।

রোহিঙ্গাদের জাতিগত ও ধর্মীয় নিপীড়ন

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি মুসলিম জাতিগোষ্ঠী। দীর্ঘদিন ধরেই তাদের নাগরিকত্ব ও জাতিগত পরিচয় অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমার সরকার। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব বাতিলের মাধ্যমে অধিকাংশ রোহিঙ্গা মুসলিমরা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে। মুসলিম পরিচয়ের কারণে বৈষম্য, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ও ধর্মীয় নিপীড়নের অভিযোগও ছিল দীর্ঘদিনের।

দেশটির সরকারের দাবি, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন আরসার হামলার পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী উত্তর রাখাইনে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। জাতিসংঘের তদন্তে উঠে আসে, এই অভিযানে সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা হত্যা, গণধর্ষণ, নির্যাতন এবং গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেয়ার মতো নৃশংসতা চালায়। অভিযানের নির্মম লালসার শিকার হয় নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ সাধারণ রোহিঙ্গা মুসলিমরা।

জাতিসংঘের তদন্তকারীরা জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয় ধ্বংসের উদ্দেশ্য থাকার যুক্তিসংগত ভিত্তি পাওয়া গেছে। মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষ ও বৈষম্যমূলক নীতিও এই নিপীড়নের পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ শুধু ধর্মীয় পরিচয় নয়, রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী হিসেবে তাদের অস্তিত্বকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।

গাম্বিয়ার মামলা ও আদালতের কার্যক্রম

এই নৃশংসতার বিচার চেয়ে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার সমর্থনে করা মামলায় অভিযোগ আনা হয়, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার গণহত্যা সনদ লঙ্ঘন করেছে।

২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি আদালত রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা, গণহত্যার আলামত সংরক্ষণ এবং এ বিষয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন দেয়ার অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয়। ২০২২ সালে আদালত মামলাটি পরিচালনার এখতিয়ার নিশ্চিত করে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় মূল মামলার শুনানি।

অবশেষে, আগামী বৃহস্পতিবার (১৯ নভেম্বর) নেদারল্যান্ডসের হেগে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায় ঘোষণা করবে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত। এ রায় মিয়ানমারের গণহত্যা সনদ লঙ্ঘনের দায় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের দুর্দশা

এদিকে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার দুর্দশা এখনো কাটেনি। খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষাসংকটের পাশাপাশি রাখাইনে সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতায় অনিশ্চিত তাদের প্রত্যার্বাসন। নিজ ভূমিতে ফেরা ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকা রোহিঙ্গাদের কাছে ১৯ নভেম্বরের রায় হতে পারে নতুন আশার মাইলফলক।