মঙ্গলবার

৩ নভেম্বর, ২০২৬ ১৯ কার্তিক, ১৪৩৩

মধ্যবর্তী নির্বাচনে বদলাতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩ নভেম্বর, ২০২৬ ১৭:১২

আপডেট: ৩ নভেম্বর, ২০২৬ ১৭:১৪

শেয়ার

মধ্যবর্তী নির্বাচনে বদলাতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে আপাতদৃষ্টিতে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখা হলেও এর প্রভাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পড়তে পারে। বিশেষ করে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও দেশের অর্থনীতির মধ্যকার গভীর সম্পর্ক এবারের নির্বাচনে নতুন করে সামনে এসেছে।

সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের ব্যয়, উচ্চ জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন বিতর্কিত মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন তা কতটা কাটিয়ে উঠতে ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে, অর্থাৎ দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পর মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের পদ নির্ধারিত না হলেও মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হয়। ফলে এ নির্বাচনকে বর্তমান প্রশাসনের ক্ষমতা ও কর্মকাণ্ডের ওপর একধরনের গণভোট বা মূল্যায়ন হিসেবেও দেখা হয়।

এবারও মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের প্রতীক হাতি এবং বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের প্রতীক গাধার মধ্যে লড়াই হবে। ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান কিংবা ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে যারা জয়ী হবেন, তাদের ফলাফল ভবিষ্যতে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনতে পারে।

নিরপেক্ষ বিশ্লেষকদের বরাতে বলা হয়েছে, ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদ ও কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট—উভয় জায়গাতেই জয়ী হওয়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। এমনটি হলে গত দুই বছর ধরে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকানদের যে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ছিল, তা দুর্বল হয়ে ডেমোক্র্যাটদের হাতে ক্ষমতার কিছুটা অংশ চলে আসবে।

ডেমোক্র্যাটরা জিতলে যেসব পরিবর্তন আসতে পারে

কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেনের জন্য সামরিক ও আর্থিক সহায়তা, ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও বৈদেশিক সহায়তার বাজেট।

ইরান যুদ্ধের লাগাম টানার উদ্যোগ

ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু করার আগে কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি ট্রাম্প। এতে সিনেটর থেকে শুরু করে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়।

ট্রাম্পকে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করার লক্ষ্যে ডেমোক্র্যাটরা একাধিকবার ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি প্রস্তাব কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার সমর্থনে পাস হলেও ট্রাম্প প্রশাসন তা উপেক্ষা করে।

ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ভালো ফল করলে ইরান যুদ্ধ নিয়ে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণে নির্বাচনটির দিকে গভীরভাবে নজর রাখবে তেহরানও।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিরক্ষা ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে পারেন। এর মাধ্যমে ট্রাম্পকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে বাধ্য করার চেষ্টা হতে পারে। পাশাপাশি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের যুদ্ধের পরিকল্পনা ও কৌশল নিয়ে প্রকাশ্যে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করতে পারেন তারা।

ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তার সম্ভাবনা

রাশিয়ার আক্রমণ প্রতিহত করতে ইউক্রেনের প্রতি ব্যাপক সমর্থন রয়েছে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের মধ্যে। তবে এই সমর্থন থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প ইউক্রেনকে সরাসরি মার্কিন আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়া স্থগিত রেখেছেন।

সম্প্রতি ট্রাম্প একটি আইনে স্বাক্ষর করার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রাশিয়ার ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছেন। এতে কংগ্রেসের সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতারাও রয়েছেন।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে উভয় কক্ষে জয়ী হলে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে কোন বিষয়ে কখন ভোট হবে, তা নির্ধারণের সুযোগ পাবেন। এর ফলে ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তা অনুমোদনের পথ তৈরি হতে পারে।

এমন কোনো সিদ্ধান্তে ট্রাম্প ভেটো দিলেও কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন পাওয়া গেলে সেই ভেটো বাতিল করা সম্ভব। এ ছাড়া ট্রাম্পের অন্যান্য কর্মকাণ্ডও ডেমোক্র্যাটদের নজরদারি ও সমালোচনার মুখে পড়তে পারে।

ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা বন্ধের উদ্যোগ

গাজা যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে চলমান সহিংসতা এবং রিপাবলিকানদের সঙ্গে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও এ অবস্থার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ডেমোক্র্যাটরা ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক সহায়তা সীমিত বা বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে পারেন। চলতি অর্থবছরে ইসরায়েলের জন্য মার্কিন সহায়তার পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। অন্য যেকোনো দেশকে দেওয়া সহায়তার তুলনায় এ পরিমাণ বেশি।

সামরিক ব্যয় সীমিত ও বৈদেশিক সহায়তা পুনর্বহাল

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সামরিক ব্যয় সীমিত করার সম্ভাবনা রয়েছে। ট্রাম্প চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট ৬৭ শতাংশ বাড়িয়ে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার করার অনুরোধ করেছিলেন।

তবে ইরান যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শ না করা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিতে ব্যাপক কাটছাঁটের বিষয় তুলে ধরে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে এ প্রস্তাব আটকে দেন।

এ ছাড়া কংগ্রেস অনুমোদিত কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক সহায়তা আটকে রেখেছেন বা বাতিল করেছেন ট্রাম্প। এসব সহায়তা কমানোর ঘটনায় ক্ষুব্ধ ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতা পেলে তহবিলগুলো পুনরায় চালুর চেষ্টা করতে পারেন।

রিপাবলিকানরা জিতলে যে নীতি গুরুত্ব পাবে

অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ আরও বাড়বে।

ধারণা করা হচ্ছে, প্রথমেই ট্রাম্প সামরিক বাজেট বাড়িয়ে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের উদ্যোগ নিতে পারেন। কারণ, রিপাবলিকানরা ঐতিহ্যগতভাবেই প্রতিরক্ষা খাতে বেশি বরাদ্দের পক্ষে।

ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য নীতিতেও কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এ ক্ষেত্রে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ বাড়ানো, নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং কঠোর অবস্থানের পক্ষে কংগ্রেসে আইন অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

একইভাবে ইউক্রেনসহ অন্যান্য দেশের সংঘাতে মার্কিন অর্থায়নের ওপর কঠোর নজরদারি বাড়তে পারে। বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় আর্থিক সহায়তা কমানো এবং কঠোর নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। কারণ, রিপাবলিকানরা অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত বৈদেশিক ব্যয়ের বিরোধী।

নিজস্ব করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে প্রতিপক্ষের বাজেয়াপ্ত সম্পদ, যেমন রাশিয়ার সম্পদ থেকে অর্থ সংগ্রহের নীতিও নিতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন।

এ ছাড়া অভিবাসন নীতি আরও কঠোর হতে পারে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও চীন-সম্পর্কিত বিষয়েও কঠোর সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

বহুপক্ষীয় চুক্তি কিংবা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতাধীন ব্যবস্থার চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে আমেরিকা ফার্স্ট নীতিই বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। ফলে সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যনীতি জোরদার এবং নতুন করে শুল্ক আরোপের সম্ভাবনাও রয়েছে।