হঠাৎ করেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নাগরিকদের অন্তত তিন দিন থেকে এক সপ্তাহের খাবার ও পানি মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি এসব নির্দেশনার পর টিনজাত খাবার, বোতলজাত পানি, টর্চলাইট ও ব্যাটারিচালিত রেডিও কেনার প্রবণতা বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্বজুড়ে কি বড় কোনো যুদ্ধ বা মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে?
যুক্তরাজ্য সরকার সম্প্রতি ‘বি রেডি’ নামে একটি জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান শুরু করেছে। এর লক্ষ্য, বড় ধরনের সংকট বা বিদ্যুৎবিভ্রাটের প্রথম ৭২ ঘণ্টা যেন নাগরিকেরা নিজেদের মৌলিক চাহিদা নিজেরাই পূরণ করতে পারেন। এ জন্য পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের দৈনিক তিন লিটার খাবার পানি, অপচনশীল শুকনো বা টিনজাত খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পাওয়ার ব্যাংক এবং হাতল ঘুরিয়ে চালানো যায় এমন রেডিও মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ঝড়, বন্যা ও সাইবার হামলার ঝুঁকি
ব্রিটিশ সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঝড়, আকস্মিক বন্যা কিংবা সাইবার হামলায় জাতীয় বিদ্যুৎব্যবস্থা বিপর্যস্ত হলে জরুরি সেবা দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। নাগরিকেরা প্রথম কয়েক দিন নিজেদের মজুত করা রসদ দিয়ে চলতে পারলে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের দ্রুত সহায়তা দিতে পারবে।
সরকারের এই আহ্বানের পর যুক্তরাজ্যের খুচরা বাজারেও প্রভাব পড়ে। সুপারমার্কেট চেইন আইসল্যান্ডে টিনজাত পণ্যের বিক্রি প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়। ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের দোকানগুলোতে রেডিও বিক্রি ১৬০ শতাংশ এবং টর্চলাইটের বিক্রি প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বাড়তে দেখা গেছে। তবে খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং দেশে কোনো খাদ্যসংকট তৈরি হয়নি।
দেশভেদে প্রস্তুতির সময়সীমা আলাদা
একই ধরনের নাগরিক প্রস্তুতির নির্দেশনা রয়েছে বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশে। নিউজউইকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডা, জাপান, মেক্সিকো ও নেদারল্যান্ডসেও পরিবারগুলোকে অন্তত তিন দিনের জরুরি প্রস্তুতি রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সুইডেন ও নরওয়ে নাগরিকদের অন্তত এক সপ্তাহের এবং জার্মানি প্রায় ১০ দিনের প্রয়োজনীয় রসদ মজুত রাখার পরামর্শ দিচ্ছে। তবে দেশগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান ও দুর্যোগের ধরন অনুযায়ী প্রস্তুতির অগ্রাধিকার আলাদা। জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্প ও সুনামির ঝুঁকি গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকোতে ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ইউরোপে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও বিবেচনায়
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তুতি পরিকল্পনায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশনের ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’তে জলবায়ুজনিত ঝুঁকির পাশাপাশি সাইবার হামলা ও বহিরাগত আগ্রাসনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সুইডেনের ‘ইফ ক্রাইসিস অর ওয়ার কামস’ নির্দেশিকায় সংকটকালীন পরিস্থিতির পাশাপাশি যুদ্ধের সময় টিকে থাকার প্রস্তুতি সম্পর্কেও নাগরিকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতে এ ধরনের নির্দেশিকা বহু দশকের পুরোনো ঐতিহ্যের অংশ। এসব নির্দেশনা জারির অর্থ এই নয় যে, কোনো যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী বা আসন্ন।
মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ৯০ দিনের প্রস্তুতি
সামরিক ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ানের এক সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘ফোর্ট্রেস আমেরিকা’ উদ্যোগের আওতায় গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলোকে বাইরের রসদ ছাড়াই অন্তত ৯০ দিন সচল রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ঘাঁটিগুলোর নিজস্ব জ্বালানি ও বিদ্যুৎব্যবস্থা নিশ্চিত করা, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা এবং জরুরি রসদের মজুত দ্বিগুণ করা। তবে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে, এটি সামরিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ও কার্যক্রম সচল রাখার অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা। সাধারণ জনগণকে ৯০ দিনের রসদ মজুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
আসন্ন যুদ্ধের সংকেত নয়, বহুমুখী ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি
বিবিসি, নিউজউইক, স্কাই নিউজ ও দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এবং সরকারি নথিপত্রের আলোচনায় এসব প্রস্তুতির পেছনে একাধিক কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে চরম আবহাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় পক্ষের সাইবার হামলা এবং আকস্মিক বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
অর্থাৎ, বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের খাবার ও পানি মজুত রাখার পরামর্শকে আসন্ন বিশ্বযুদ্ধের নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখার ভিত্তি নেই। বরং জরুরি পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলে নাগরিকেরা যেন প্রাথমিকভাবে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পারেন, সে জন্যই এসব প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মহামারি, যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক অস্থিরতা ও চরম আবহাওয়ার মতো বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলায় নাগরিকদের প্রস্তুত রাখা এসব সরকারি উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
আরও পড়ুন:







