আর্মেনিয়ার পার্লামেন্টে ‘যৌনতা মন্ত্রণালয়’ গঠনের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে সংসদ সদস্যদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় আইনপ্রণেতাদের পরস্পরের দিকে কিল-ঘুষি, লাথি ও চেয়ার ছুড়ে মারতে দেখা যায়। বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ পরে পার্লামেন্টের করিডোরেও ছড়িয়ে পড়ে।
কী নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত
চলতি বছরের শুরুর দিকে আর্মেনিয়ার বিরোধী দল স্ট্রং আর্মেনিয়া পার্টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ক্ষমতায় গেলে দেশে কোনো অসন্তুষ্ট নারী থাকবে না—এমন লক্ষ্য নিয়ে একটি ‘সেক্স মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করবে তারা। দলটির দাবি ছিল, যৌন অসন্তুষ্টির কারণে মধ্যবয়সী শ্বেতাঙ্গ নারীদের মধ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন এই মন্ত্রণালয় প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে প্রস্তাবটি নিয়ে বিতর্কের একপর্যায়ে ক্ষমতাসীন সিভিল কন্ট্রাক্ট পার্টির সংসদ সদস্য তারন চাখোয়ান বিরোধীদের দুর্নীতিতে নিমজ্জিত বলে অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত মন্ত্রণালয়ের জন্য বিরোধী দলের নেতাকে নারীদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান তিনি।
চাখোয়ান স্ট্রং আর্মেনিয়ার নেতা নারেক রাপেতিয়ানকে আপাদমস্তক ঝামেলা বলে কটাক্ষ করলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে। একপর্যায়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা আসন ছেড়ে উঠে চাখোয়ানের বক্তব্য দেওয়ার ডায়াসের দিকে ছুটে যান। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়।
চেয়ার ছোড়াছুড়ি, ভাঙচুর ও সংঘর্ষ
সংঘর্ষের সময় সংসদ সদস্যদের একে অপরকে কিল-ঘুষি ও লাথি মারতে দেখা যায়। পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার ও সিভিল কন্ট্রাক্ট পার্টির সদস্য ভাহাগন আলেকসানিয়ান বিরোধী সংসদ সদস্যদের লক্ষ্য করে একটি চেয়ার ছুড়ে মারেন। অন্যদিকে চাখোয়ান বিরোধী দলের সংসদ সদস্য গার্নিক দাভতিয়ানের গায়ে পানি ছিটান। এ সময় অন্য সংসদ সদস্যরা বোতল ছোড়েন এবং বেশ কয়েকটি টেবিল ভেঙে ফেলা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রথমে স্পিকার অধিবেশন মুলতবি করবেন না বলে ঘোষণা দেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, সবাই যেন ঘটনাটি সরাসরি দেখতে পারেন। তবে সংঘর্ষের মাত্রা বেড়ে গেলে তিনি অধিবেশনে বিরতি ঘোষণা করতে বাধ্য হন।
বিরতির পরও সংঘর্ষ থামেনি। পার্লামেন্টের করিডোরে দুই পক্ষের সদস্যদের মধ্যে হাতাহাতি চলতে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরাপত্তাকর্মীদের দুই দলের মাঝখানে মানবপ্রাচীর তৈরি করতে হয়। বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় ও ছেঁড়া পোশাক পরে পার্লামেন্ট কক্ষ থেকে বের হতে দেখা যায়।
সহিংসতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
সংঘর্ষের পর সংবাদ সম্মেলনে আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান সহিংসতার নিন্দা জানান। তবে তিনি বলেন, সিভিল কন্ট্রাক্ট পার্টির সংসদীয় উপদল যে ব্যবস্থা নিয়েছে, তিনি তা সমর্থন করেন। তাঁর ভাষ্য, বিরোধী দলে থাকার অর্থ এই নয় যে কেউ উদ্ধত আচরণ করতে পারবেন।
চেয়ার ছোড়ার ঘটনা প্রসঙ্গে পাশিনিয়ান বলেন, চেয়ার ছোড়া হোক বা অন্য কিছু, যা ঘটেছে তা যথাযথ ও সঠিক ছিল।
পরে ফেসবুকে কৌতুক করে তিনি লেখেন, বিরোধী দলের নাম স্ট্রং আর্মেনিয়া হলেও দলটির সংসদ সদস্যরা শারীরিকভাবে শক্তিশালী নন।
পাশিনিয়ানের ওই পোস্টের মন্তব্যের ঘরে চাখোয়ান লেখেন, তাঁর কিছুটা খারাপ লাগছে। স্ট্রং আর্মেনিয়ার সদস্যরা লড়াই শুরু করে পরে পালিয়ে যান বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে চাখোয়ান বিরোধীদের আচরণকে গুণ্ডামি বলে অভিহিত করেন এবং জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে সংঘাত উসকে দিয়ে মার না খেয়ে পালিয়ে যাওয়া চলবে না।
অন্যদিকে বিরোধী নেতা কারাপেতিয়ান সংঘর্ষের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি ঘটনাটিকে খাঁটি আর্মেনীয় ধাঁচের পুরুষে পুরুষে স্বাভাবিক লড়াই বলে অভিহিত করেন। তাঁর দাবি, যারা মাসের পর মাস ধরে তাঁদের অতিষ্ঠ করে তুলেছিল, তারা এবার সরাসরি কঠোর জবাব পেয়েছে।
ফৌজদারি ব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা
সংঘর্ষের ঘটনায় কোনো ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে আর্মেনিয়ার প্রসিকিউটর জেনারেলের কার্যালয় স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানায়, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
আলবেনিয়ার পার্লামেন্টেও হট্টগোল
এদিকে বৃহস্পতিবার আলবেনিয়ার পার্লামেন্টেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেখানে বিরোধী সংসদ সদস্যরা স্মোক বোমা ফাটান এবং ডায়াস অবরুদ্ধ করেন।
বিতর্কিত একটি রিসোর্ট প্রকল্পকে কেন্দ্র করে আলবেনিয়ায় কয়েক মাস ধরে চলা ফ্লেমিংগো আন্দোলন পরে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।
সেন্ট্রাল ব্যাংক অব আলবেনিয়া-সংক্রান্ত একটি আইনের সংশোধনীতে ভোট গ্রহণের সময় ক্ষমতাসীন সোশ্যালিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে বিরোধী সংসদ সদস্যরা হট্টগোল শুরু করেন। এ সময় তাঁরা প্রধানমন্ত্রী এডি রামার পদত্যাগ দাবি করেন।
আরও পড়ুন:







