যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সামরিক চাপ ও হামলার মধ্যেও ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সচল রয়েছে। ২০২৬ সালের যুদ্ধের পর দেশটির নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা ও সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যুর পর নতুন ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছেন। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ও জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ভূমিকা বেড়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ইরানের ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক শীর্ষে রয়েছেন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। তবে সামরিক অভিযান, জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনীতি, প্রশাসন ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করছেন।
কৌশলগত গবেষণা সংস্থা ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসের (আইএফআরআই) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের ক্ষমতাকাঠামোতে সর্বোচ্চ নেতার কর্তৃত্বের পাশাপাশি সামরিক, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত ভূমিকা রয়েছে।
ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর শীর্ষ আট ব্যক্তি
১. মোজতবা খামেনি: সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রে
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দেশটির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সাংবিধানিক শীর্ষে রয়েছেন। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে সামরিক কমান্ডার নিয়োগ, যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা নীতি এবং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্তে তাঁর কর্তৃত্ব রয়েছে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তাঁর বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ৮ মার্চ তিনি সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। এরপর থেকে তাঁকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, নিরাপত্তাজনিত কারণে আড়ালে থাকলেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত রয়েছেন।
২. মোহসেন রেজায়ি: জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সমন্বয়
ইরানের সাবেক আইআরজিসি প্রধান মোহসেন রেজায়ি সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৬ সালের আগস্টে তাঁকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি আইআরজিসির প্রধান ছিলেন।
জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ দেশটির প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সমন্বয় করে। ফলে যুদ্ধকালীন কৌশল নির্ধারণ ও আন্তর্জাতিক আলোচনায় রেজায়ির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
৩. আহমাদ ওয়াহিদি: আইআরজিসির প্রধান
মেজর জেনারেল আহমাদ ওয়াহিদি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমান্ডার-ইন-চিফ। ২০২৬ সালের আগস্টে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁকে এ পদে নিয়োগ দেন।
আইআরজিসি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক সামরিক তৎপরতা, বিশেষ অভিযান এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর আগে ওয়াহিদি প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
৪. আলী আবদোল্লাহি: সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বিত কমান্ড
২০২৬ সালের আগস্টে আলী আবদোল্লাহিকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধান করা হয়। সেনাবাহিনী, আইআরজিসি ও অন্যান্য সামরিক ইউনিটের মধ্যে সমন্বয়, সামরিক প্রস্তুতি এবং সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বাহিনীর কার্যক্রম সমন্বয় এবং সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাঁর পদ গুরুত্বপূর্ণ।
৫. হোসেইন তায়েব: বাসিজ বাহিনীর প্রধান
হোসেইন তায়েব দীর্ঘ সময় আইআরজিসির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ছিলেন। ২০২৬ সালের আগস্টে তাঁকে বাসিজ বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বাসিজ আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণাধীন একটি আধাসামরিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে বাহিনীটির ভূমিকা রয়েছে।
৬. মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ: পার্লামেন্টের স্পিকার
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সাবেক আইআরজিসি কর্মকর্তা ও তেহরানের সাবেক মেয়র হিসেবে তাঁর সামরিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে।
আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং সরকারের কার্যক্রম তদারকির পাশাপাশি যুদ্ধকালীন সময়ে রাজনৈতিক সমন্বয় ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের পক্ষে সমর্থন তৈরিতে তাঁর ভূমিকা রয়েছে।
৭. মাসুদ পেজেশকিয়ান: প্রেসিডেন্ট ও নির্বাহী সরকারের প্রধান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নির্বাচিত সরকারের প্রধান। মন্ত্রিসভা পরিচালনা, অর্থনীতি, প্রশাসন ও দৈনন্দিন রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
২০২৪ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবেও তাঁর দায়িত্ব রয়েছে। তবে ইরানের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তানীতি সর্বোচ্চ নেতার কর্তৃত্বাধীন।
যুদ্ধের মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
৮. আব্বাস আরাগচি: আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রধান মুখ
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশটির অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা, ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক যোগাযোগে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে।
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বর্তমান সংঘাতের মধ্যেও ইরানের অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরা এবং যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে যোগাযোগ রাখা তাঁর দায়িত্বের অংশ।
বিচার বিভাগেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাকেন্দ্র
এই আটজনের বাইরে ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গুলামহোসেইন মোহসেনি এজেই ক্ষমতাকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। বিচার বিভাগ পরিচালনা, মামলা এবং আইনগত কার্যক্রমের ক্ষেত্রে তাঁর কর্তৃত্ব রয়েছে। দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিচার বিভাগের ভূমিকার কারণে তাঁকেও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাকেন্দ্রের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
যুদ্ধের পর ইরানের ক্ষমতার সমীকরণ
২০২৬ সালের যুদ্ধের পর ইরানের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তির মৃত্যুর পর নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নিয়েছে। তবে দেশটির সামরিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রয়েছে।
আইএফআরআইয়ের বিশ্লেষণে যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের ক্ষমতাকাঠামোকে আরও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক ও সমন্বিত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব ধরে রেখেছেন। পাশাপাশি আইআরজিসি, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, সামরিক জেনারেল স্টাফ, প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের নেতৃত্ব বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করছে।
মোজতবা খামেনির জনসমক্ষে অনুপস্থিতি এবং যুদ্ধের মধ্যে নেতৃত্ব পুনর্গঠনের ফলে বাস্তব ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও সামরিক কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে, তা নির্ভর করছে এসব ব্যক্তি ও তাঁদের নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর।
আরও পড়ুন:







