শনিবার

২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৯ কার্তিক, ১৪৩৩

শত শত মুসলিমকে পায়ে গুলি করে পঙ্গু করেছে ভারতের পুলিশ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:২৭

শেয়ার

শত শত মুসলিমকে পায়ে গুলি করে পঙ্গু করেছে ভারতের পুলিশ
ছবি সংগৃহীত

ভারতের উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে শত শত মুসলিম নাগরিককে পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ধরনের বিচারবহির্ভূত নিপীড়নের মাধ্যমে মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

স্থানীয়ভাবে অপারেশন ল্যাংড়া নামে পরিচিত এই কৌশল উত্তর প্রদেশ ছাড়িয়ে ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেটের গবেষণার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২০ সাল থেকে উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে প্রায় ৬৫০টি ঘটনায় পুলিশ গুলি চালিয়ে সন্দেহভাজনদের আহত করেছে। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আক্রান্তদের প্রায় সবাই মুসলিম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনায় গুলির আঘাতের স্থান প্রায় একই, পায়ের হাঁটুর ঠিক নিচে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, পুলিশ যেসব ঘটনা জনসমক্ষে এনেছে, শুধু সেগুলোর ভিত্তিতেই এই হিসাব করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

পুলিশের দাবি, আত্মরক্ষায় গুলি চালানো হয়

উত্তর প্রদেশের জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা অমিতাভ জাস অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, পুলিশ কেবল আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালায়। হাঁটুর নিচে গুলি করার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।

তবে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকেরা এ ধরনের গুলির পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কলিম খান বলেন, দৌড়ে পালানো বা সংঘর্ষে লিপ্ত কোনো ব্যক্তির পায়ে দূর থেকে গুলি লেগে হাড় এড়িয়ে শুধু মাংসপেশি ভেদ করা বাস্তবে অসম্ভব। তাঁর মতে, এ ধরনের গুলি আত্মরক্ষার জন্য নয়, বরং খুব কাছ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চালানো হয়েছে।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে হাইকোর্টের সমালোচনা

বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড নিয়ে ভারতের বিচার বিভাগ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে এলাহাবাদ হাইকোর্ট উত্তর প্রদেশ পুলিশের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন। আদালত জানান, বিচার পরিচালনায় পুলিশের এ ধরনের স্বঘোষিত ভূমিকা সম্পূর্ণ বেআইনি।

হাইকোর্টের এক বিচারক মন্তব্য করেন, পুলিশের এনকাউন্টার, বিশেষ করে সন্দেহভাজনদের পায়ে গুলি করার ঘটনা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, যা সংবিধানের পরিপন্থী।

মানবাধিকারকর্মী সন্দীপ পান্ডে অভিযোগ করেছেন, এটি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সহিংসতা। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার এবং উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ধর্মীয় আবেগ ও জিরো টলারেন্স নীতিকে কাজে লাগিয়ে হিন্দু ভোটারদের আকৃষ্ট করতে মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করছেন।

পুলিশে মুসলিম সদস্যের হার ৪ দশমিক ৮ শতাংশ

প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উত্তর প্রদেশের পুলিশ বাহিনীতে মুসলিম সদস্যের হার মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে, গরু পাচারের অভিযোগে আহত সন্দেহভাজনদের প্রায় ৯৩ শতাংশই মুসলিম।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলো চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মহিষের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এক ভুক্তভোগীর মা জানিয়েছেন, তাঁর ছেলেকে গরু পাচারের মিথ্যা অভিযোগে আটক করে দুই হাঁটুতেই গুলি করা হয়েছে। পঙ্গু হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন কাজ করতে পারেন না। মানুষের সাহায্য ও ঋণের ওপর নির্ভর করে কোনোমতে পরিবারটি বেঁচে আছে।

মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, এ ধরনের হাফ এনকাউন্টার বা কাউকে পঙ্গু করে দেওয়ার কৌশল বন্ধ না হলে ভারতের আইনি ব্যবস্থা ও গণতন্ত্র গুরুতর হুমকির মুখে পড়তে পারে।