অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীদের হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর হেবরন শহরে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও ভবন ভাঙতে শুরু করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। হামলাকারীরা যে এলাকা থেকে এসেছেন, সেটি ধ্বংস করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা পর্যালোচনা করেছেন তিনি।
হেবরনের একটি চেকপোস্টে দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত এবং আরও তিনজন আহত হন। পরে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে দুই হামলাকারী নিহত হন।
পশ্চিম তীরে বড় সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি
ঘটনাস্থলে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু জানান, হামলাকারীরা যে এলাকায় বসবাস করেন, সেটি ধ্বংস করে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া হবে। পশ্চিম তীরে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতিও রয়েছে ইসরায়েলের। তবে কবে এ অভিযান শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময় জানাননি তিনি।
প্রায় দুই লাখ মানুষের বসবাসের শহর হেবরন এবং পাশের হালহুল শহরের চারপাশে অবরোধ আরোপ করা হয়েছে বলেও জানান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
পশ্চিম তীরের শরণার্থীশিবিরগুলোতে ইসরায়েলের আগের সামরিক অভিযানের উদাহরণও টেনেছেন নেতানিয়াহু। সেসব অভিযানে আবাসিক ভবন ধ্বংস করা হয়েছিল এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন।
হামলা ও অস্ত্র উদ্ধারের দাবি
যাচাই করা ভিডিও ফুটেজে ইসরায়েলি সেনা ও বন্দুকধারীদের মধ্যে তীব্র গোলাগুলির দৃশ্য দেখা গেছে। অন্য একটি ভিডিওতে দুই বন্দুকধারীকে একটি গাড়ি থেকে নেমে চেকপোস্টে থাকা সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে দেখা যায়। তাদের একজনের হাতে পিস্তল এবং অন্যজনের হাতে অ্যাসল্ট রাইফেলের মতো অস্ত্র ছিল বলে ফুটেজে প্রতীয়মান হয়। পরে সেনারা পাল্টা গুলি চালান।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, হামলাকারীদের গাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর ধারণা, বন্দুকধারীরা কাছের রুট ৩৫ সড়কে আরও বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে পথে চেকপোস্টের মুখোমুখি হওয়ায় তারা সেখানে গুলি চালাতে শুরু করেন।
বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ
পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের একটি অংশের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে এ ধরনের সহিংসতা বেড়েছে।
ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া ইসরায়েলি বাহিনীর দীর্ঘদিনের একটি চর্চা। ইসরায়েলের মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ নীতির সমালোচনা করে একে সমষ্টিগত শাস্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী ও উগ্র ডানপন্থী নেতা বেজালেল স্মোট্রিচ পশ্চিম তীরে গাজা বা লেবাননের মতো সামরিক অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ভেঙে দেওয়ার দাবিও তুলেছেন।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিতর্ক
ইসরায়েলে চার দিন পর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে হামলার আশঙ্কা নিয়ে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সমালোচনা করে বিরোধী নেতারা সরকারকে দুর্বল করছেন। ভবিষ্যতে ইসরায়েলে কোনো হামলা হলে তার জন্য বিরোধী নেতারাও দায়ী থাকবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, বিরোধী নেতারা নিহত সেনাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী পদের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট হামলাকারীদের প্রতিহত করা ব্যক্তিদের প্রশংসা করেছেন।
চলতি বছরে পশ্চিম তীরে নিহত ৯৬ ফিলিস্তিনি
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ইসরায়েলি বাহিনী বা বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অধিকৃত পশ্চিম তীরে অন্তত ৯৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের হামলায় পশ্চিম তীরে চারজন ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। তবে শুক্রবারের হামলায় নিহত দুই ইসরায়েলি সেনার হিসাব ওই সংখ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।
হেবরনে নতুন করে বাড়িঘর ধ্বংস এবং পশ্চিম তীরে বড় সামরিক অভিযান চালানোর হুঁশিয়ারিতে অঞ্চলটিতে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহু সরকারের নিরাপত্তানীতি নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে।
আরও পড়ুন:







