শনিবার

২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৯ কার্তিক, ১৪৩৩

ইরানে নতুন হামলার ইঙ্গিত ট্রাম্পের, বাড়ছে যুদ্ধের শঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৪৬

শেয়ার

ইরানে নতুন হামলার ইঙ্গিত ট্রাম্পের, বাড়ছে যুদ্ধের শঙ্কা
ছবি সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানে আবারও সামরিক অভিযান চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তুতি জোরদার হওয়ার বিভিন্ন লক্ষণের কথা তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরুর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ফ্লোরিডায় এক সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, অপারেশন এপিক ফিউরি নামে আবারও ছোট পরিসরে সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে। ইরানে হামলার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত নাম অপারেশন এপিক ফিউরি।

এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে পারে। তবে সংঘাত দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা উচিত, নাকি ধীরে ধীরে এর অবসান ঘটতে দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

হামলার সম্ভাবনা নাকচ করছেন না মার্কিন রাষ্ট্রদূত

তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাকও চলতি সপ্তাহান্তে ইরানে হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, চলতি সপ্তাহান্তে হামলা হতে পারে কি না। জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই হতে পারে।

ব্যারাক বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান স্পষ্ট। তিনি একটি চুক্তির বিষয়ে আগ্রহী এবং প্রস্তুত। কয়েক মাস ধরে দুই পক্ষ আলোচনার টেবিলে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে, আগামী মঙ্গলবার নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাওয়া ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বারবার ইরানের সরকারকে উৎখাতের অঙ্গীকার করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই সংঘাতের সামরিক সমাধান পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের বাহিনীগুলো বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে নিয়মিত হামলা চালানোর ধারায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সেপ্টেম্বরের শুরুর দিক থেকে কোনো পক্ষই স্থলভাগে বড় ধরনের হামলা চালায়নি। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন যেকোনো সময় ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নির্বাচনের পর হামলার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞের

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফরেন পলিসি প্রোগ্রামের পরিচালক সুজান ম্যালনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে হামলা শুরু হতে পারে।

সম্ভাব্য সংঘাতের কয়েকটি লক্ষণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম ও সেনা মোতায়েন, ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সতর্কবার্তা দেওয়া এবং ইসরায়েলি বাহিনীর সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকা পরিস্থিতির গুরুত্ব নির্দেশ করে।

ম্যালনির মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে ইরানের জনগণ চরম দুর্ভোগের মুখে পড়ছে। অন্যদিকে, অবরোধ কার্যকর রাখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ নৌ-সম্পদ ও সামরিক সক্ষমতা ওই অঞ্চলে আটকে রয়েছে। কূটনীতি অথবা সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতির সমাধান প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যে আরও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের পরিকল্পনা

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো জেসন ক্যাম্পবেল বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এমন কিছু লক্ষণ দেখা গেছে, যা ইরানে নতুন করে হামলার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। ইরান অথবা ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুথিদের পক্ষ থেকে হামলার আশঙ্কা করছে যুক্তরাষ্ট্র বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মার্কিন সামরিক প্রস্তুতির বিষয়ে ক্যাম্পবেল জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলে বিমানবাহী রণতরি দলের সংখ্যা সাময়িকভাবে তিনটিতে উন্নীত হতে পারে। এ ছাড়া, সেখানে আরও একটি মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো সম্প্রতি ইরানে আগের হামলার আদলে শক্তি প্রদর্শন করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

তবে নতুন করে হামলা ঠিক কখন শুরু হতে পারে, তা নির্দিষ্ট করে বলা অসম্ভব বলে মনে করেন ক্যাম্পবেল। তাঁর মতে, ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার জন্যই যদি এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সামরিক প্রস্তুতির ব্যাপ্তি অনেক বড়।

স্থল অভিযানে সীমিত হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা

ক্যাম্পবেলের মতে, সংঘাতের শুরুর তুলনায় ট্রাম্পের হাতে এখন বিকল্প অনেক সীমিত। ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতির কারণে সম্ভাব্য স্থল অভিযান পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, এ মুহূর্তে এমন কোনো নিরাপদ জায়গা নেই, যেখানে এ ধরনের অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় হাজার হাজার, এমনকি কোনো কোনো পরিস্থিতিতে ১০ হাজারেরও বেশি সেনা মোতায়েন করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।

ক্যাম্পবেল আরও মনে করেন, যুদ্ধের প্রথম ৫০ দিনে ইরানে যে ধরনের হামলা চালানো হয়েছিল, একই ধরনের হামলা আবারও চালালে ইরানি শাসনের কৌশলগত অবস্থানে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। বড় ধরনের শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করতে ইরান প্রস্তুত, তা আগেই প্রমাণ করেছে।

এমনকি হামলার লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তন করে গুরুত্বপূর্ণ মিশ্র অবকাঠামো বা বেসামরিক স্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করা হলেও পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে তাঁর।