বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষা খাতের সংকট, পরীক্ষায় অনিয়ম, বেকারত্ব, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা থেকে রাজপথে নামছেন তরুণেরা। ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা, ভারতে পরীক্ষা কেলেঙ্কারি, আলবেনিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এবং বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংস্কার ও কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা—দেশভেদে আন্দোলনের কারণ আলাদা হলেও তরুণদের ক্ষোভের জায়গায় মিল রয়েছে।
২০২৫ সালেও নেপাল, মরক্কো, মাদাগাস্কার, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া ও পেরুসহ বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ হয়েছে। এসব আন্দোলনে দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্বল সরকারি সেবা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহির অভাবের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলো আবারও প্রশ্ন তুলেছে, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সরকার কতটা দায়িত্ব পালন করছে।
ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে ক্ষোভ
ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা, শিক্ষকের সংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষায় বৈষম্যের প্রতিবাদে শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন।
দেশটির বিভিন্ন শহরে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যরা আন্দোলনে যোগ দেন। তাঁদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, শিক্ষকের সংকট দূর করতে হবে এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবন সংস্কার করতে হবে।
বিক্ষোভে অংশ নেন সুইডিশ জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও। আন্দোলনকারীদের মতে, শিক্ষার মতো মৌলিক খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আন্দোলনের বেশির ভাগ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হলেও কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশি বলপ্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবির পাশাপাশি তরুণদের মতামত, অধিকার এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
ভারতে পরীক্ষা কেলেঙ্কারি থেকে জবাবদিহির দাবি
ভারতে তরুণদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সূত্রপাত পরীক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ থেকে। পরে তা শিক্ষা খাতে জবাবদিহি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নেয়।
ককরোচ জনতা পার্টি নামে পরিচিত ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের কর্মীরা প্রথমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে মাঠে নামেন। পরে নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগ এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিও ওঠে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন পরিচালনায় স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আন্দোলনটি একটি পরীক্ষা কেলেঙ্কারিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিক্ষার সুযোগ, যোগ্যতার স্বীকৃতি, চাকরির সম্ভাবনা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থার প্রশ্ন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষও এতে প্রকাশ পেয়েছে।
আলবেনিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুরবস্থা, উচ্চ টিউশন ফি এবং তরুণদের জন্য সীমিত সুযোগের প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি করছেন।
অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে রাজধানীতে টানা কয়েক দিন বিক্ষোভ চলে। পরে তা অন্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পাশাপাশি সরকারি ভবন ও ব্যাংকের শাখায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং দুর্নীতির অভিযোগের যথাযথ জবাব দেওয়া হচ্ছে না।
দেশটির দক্ষিণ উপকূলের কিছু অংশে বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও বিতর্ক তৈরি করেছে। প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আলোচনা চলছে। এ প্রকল্প ঘিরে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিক্ষোভকারীরা। তবে সরকার দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
প্রধানমন্ত্রী এদি রামা পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ নিয়ে তিনি আলোচনা করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে বিক্ষোভে সহিংসতা ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনায় কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে তাঁর সরকার। আন্দোলনকারীদের দাবি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকট সমাধানের পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
মিলানে বিক্ষোভের পর ৫০০ সেনা মোতায়েন করছে ইতালি
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটে রূপ নেওয়ার পর ইতালির মিলানে ৫০০ সেনা মোতায়েন করছে দেশটির সরকার। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে সরকার। আগামী শনিবার আরও বিক্ষোভের কর্মসূচি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার নতুন কয়েকটি নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘোষণাও দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিক্ষোভে সহিংসভাবে অংশ নেওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, দাঙ্গায় জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির বিধান এবং ভাঙচুর ও লুটপাটে অংশ নেওয়া সন্তানের কর্মকাণ্ডের জন্য মা-বাবাকে আর্থিকভাবে দায়বদ্ধ করার ব্যবস্থা।
বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের পরও প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান
বিশ্বজুড়ে তরুণদের আন্দোলনের আলোচনায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পরে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, দুর্নীতি, বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সংকট ও জবাবদিহির দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তন ঘটে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থী আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। আন্দোলন দমনে সহিংসতা, গ্রেপ্তার ও হতাহতের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। পরে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও আন্দোলনকালে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করে।
সরকারের পতনের পর তরুণদের মধ্যে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়। রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি কমানো, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি গুরুত্ব পায়। তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক তরুণের মতে, সরকার পরিবর্তনের পরও কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত পরিবর্তন নিশ্চিত হয়নি।
২০২৪ সালের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের একটি অংশ পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পুনরুত্থান এবং সংস্কারের ধীরগতিতে হতাশ হয়েছেন। আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারলেও নির্বাচনি রাজনীতিতে সেই শক্তিকে রূপ দেওয়া তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের তরুণদের উদ্বেগের অন্যতম কেন্দ্র কর্মসংস্থান। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ২০২৫ সালের তরুণদের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে প্রকাশিত নীতিপত্রে বলা হয়েছে, দেশে ৮৫ লাখের বেশি তরুণ শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নন। তরুণদের বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেও কর্মসংস্থানের সংকট প্রকট। শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অসংগতির বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
তরুণদের প্রত্যাশা এখন চাকরি পাওয়া বা নিয়োগব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান, দুর্নীতির বিচার এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিও তাঁদের দাবির অংশ।
সংস্কার নিয়ে হতাশার আরেকটি দিক সামনে এসেছে ২০২৬ সালে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা কিছু সংস্কার অধ্যাদেশ নতুন সংসদে অনুমোদন পায়নি বা বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে মানবাধিকার, বিচার বিভাগ, পুলিশ সংস্কার ও দুর্নীতি দমনসংক্রান্ত কিছু পদক্ষেপও রয়েছে। এসব পরিবর্তন নিয়ে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, তরুণদের আন্দোলন সরকার পরিবর্তনের মতো বড় রাজনৈতিক ঘটনা ঘটাতে পারে। তবে সেই পরিবর্তনকে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা পূরণ না হলে নতুন করে রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
নেপাল, মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশে একই ধরনের ক্ষোভ
তরুণদের আন্দোলন ইউরোপ বা দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালে নেপাল, মরক্কো, মাদাগাস্কার, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া ও পেরুসহ বিভিন্ন দেশে তরুণেরা বিক্ষোভে অংশ নেন। দুর্নীতি, বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ এসব আন্দোলনে গুরুত্ব পেয়েছে।
নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা তরুণদের ক্ষোভের তাৎক্ষণিক কারণ হয়ে উঠেছিল। তবে আন্দোলন দ্রুত দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থার মতো দীর্ঘদিনের অভিযোগে বিস্তৃত হয়। বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানিও ঘটে।
মরক্কোয় তরুণদের আন্দোলনে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। বড় আয়োজন ও অবকাঠামো প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে সাধারণ মানুষের মৌলিক সেবার ঘাটতি তাঁদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
দেশভেদে আন্দোলনের সূচনা ও পরিণতি আলাদা হলেও তরুণদের একটি অংশ অর্থনৈতিক সুযোগের অভাবের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও জবাবদিহিমূলক, সেই প্রশ্নও তুলছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিবাদ
সাম্প্রতিক তরুণ আন্দোলনগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য দিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে দেওয়া, কর্মসূচি সমন্বয়, ভিডিও ও ছবি প্রকাশ এবং অন্য দেশের আন্দোলন সম্পর্কে জানা আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। এসব মাধ্যম ব্যবহার করে প্রচলিত রাজনৈতিক সংগঠনের বাইরে থাকা তরুণেরাও অনেক ক্ষেত্রে একত্র হচ্ছেন।
অনেক আন্দোলন একক নেতা বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের প্রতীক, স্লোগান ও কর্মপদ্ধতি এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনেও অনলাইন যোগাযোগ ও সরাসরি সংগঠিত প্রতিবাদ পরস্পরকে শক্তিশালী করেছিল।
তবে অনলাইনে সংগঠিত হওয়াই আন্দোলনের দাবি পূরণের নিশ্চয়তা দেয় না। সরকারের প্রতিক্রিয়া, আন্দোলনের নেতৃত্ব ও কৌশল, জনসমর্থন ধরে রাখার সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পরিকল্পনা আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিক্ষোভ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করে। আবার দমন-পীড়ন বা অভ্যন্তরীণ মতভেদের কারণে আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
তরুণদের ক্ষোভের কেন্দ্রে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
বিশ্বজুড়ে এসব বিক্ষোভের একটি বড় মিল হলো ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। শিক্ষা শেষ করে কাজ পাওয়া, যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন, সাশ্রয়ী জীবনযাপন, মানসম্মত সরকারি সেবা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের মতামতের প্রতিফলন চান তরুণেরা। এসব প্রত্যাশা পূরণ না হলে তাঁদের মধ্যে হতাশা জমতে পারে।
তবে সব আন্দোলনকে একই ধরনের বা একই উদ্দেশ্যের বলা যায় না। কোথাও শিক্ষা সংস্কার প্রধান দাবি, কোথাও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, আবার কোথাও ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন মুখ্য। একই আন্দোলনের মধ্যেও বিভিন্ন গোষ্ঠীর লক্ষ্য ও কৌশলে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তরুণদের উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর সমাধান শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে সম্ভব নয়। অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত, শিক্ষায় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের অভিজ্ঞতা জানতে চাওয়া হচ্ছে
বিশ্বজুড়ে তরুণদের আন্দোলন নিয়ে তাদের মতামত ও অভিজ্ঞতা জানতে চেয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। ফ্রান্স, ভারত ও আলবেনিয়াসহ যেসব দেশে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ হয়েছে, সেসব দেশের তরুণদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, কেন তাঁরা রাজপথে নামছেন, তাঁদের চোখে আন্দোলনের গুরুত্ব কী এবং কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন।
আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেওয়া তরুণদের পাশাপাশি তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিও জানতে চাওয়া হয়েছে। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। চাইলে পরিচয় গোপন রেখেও মতামত দেওয়া যাবে।
বিক্ষোভের সংখ্যা, সংঘর্ষ কিংবা গ্রেপ্তারের খবর সংবাদ শিরোনামে উঠে এলেও আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা ও হতাশা অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। এসব অভিজ্ঞতা জানা গেলে আন্দোলনের পেছনে থাকা কারণগুলো আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব।
বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণদের আন্দোলন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী সিদ্ধান্তগুলোতে তাঁদের কণ্ঠ কতটা শোনা হচ্ছে, আর রাজপথে তৈরি হওয়া পরিবর্তনের প্রত্যাশা কতটা বাস্তব সংস্কারে রূপ নিচ্ছে?
সূত্র: আলজাজিরা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ান।
আরও পড়ুন:







