নয়াদিল্লিসহ গোটা ভারতে গত তিন মাস ধরে চলা তরুণদের আন্দোলনের ওপর প্রশাসনের একের পর এক আঘাতের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। জেনেভা থেকে বিবৃতি দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ রুখতে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর নির্মম লাঠিচার্জ চালানো হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষকে মিছিলে যোগ দিতে বাধা দেওয়া হয়েছে।
ভোটার তালিকা ছাঁটাই ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রতিবাদ
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সরকারের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং সম্প্রতি ভোটার তালিকা থেকে ঢালাও নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছেন লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, এই ভোটার তালিকা ছাঁটাইয়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ১৩ কোটি মানুষ। যাদের একটি বড় অংশ মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, পাশাপাশি তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত জনগোষ্ঠী।
মার্চে অপহরণ ও জবরদস্তির অভিযোগ
জাতিসংঘের রিপোর্টে উঠে এসেছে যে, গত মার্চে নয়াদিল্লিতে ১০ জন শিক্ষার্থী ও শ্রমিক অধিকারকর্মীকে সাদা পোশাকধারী পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। বাইরের জগৎ থেকে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় বিচ্ছিন্ন রেখে তাদের ওপর দুর্ব্যবহার, চরম হুমকি ও জবরদস্তি চালানো হয়। জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়। আদালতের হেবিয়াস কর্পাস আদেশের পরেই তাদের মুক্তি মেলে।
সাত হাজারের বেশি আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ
সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে একযোগে আটক করা হয় সাত হাজারের বেশি তরুণ, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে। তাদের দূর-দূরান্তের গোপন ও প্রত্যন্ত আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং আন্দোলনের সমস্ত তথ্য ও নথিপত্র মুছে ফেলা হয়। ২৪ ঘণ্টা পর অধিকাংশকে ছাড়া হলেও অনেক বিক্ষোভকারী মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। বিক্ষোভ চলাকালে ও আটকের পর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং যৌন নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ পেয়েছে জাতিসংঘ।
বিএনএসএস-এর ১৬৩ ধারা ও নিষেধাজ্ঞা
বিক্ষোভ দমাতে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা বা বিএনএসএস-এর বিতর্কিত ১৬৩ ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। জনসমাবেশের ওপর ঢালাও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে এবং গণপরিবহন ও ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের স্পষ্ট বক্তব্য, এসব পদক্ষেপ ভারতের আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা যেমন শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত সুরক্ষার মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। বিধিনিষেধ চাপাতে হলে তা আইনসম্মত, যৌক্তিক ও আনুপাতিক হতে হবে।
জাতিসংঘ অবিলম্বে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও ইন্টারনেট ব্যাহত করার প্রক্রিয়া বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। ডিজিটাল ও বায়োমেট্রিক নজরদারির অপব্যবহার রোধের পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর অপকর্মের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে না ঘটে এবং নারী-পুরুষের ওপর যাতে কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, সে বিষয়েও সরকারকে তাগিদ দিয়েছে জাতিসংঘ।
আরও পড়ুন:







