সোমবার

১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ৪ কার্তিক, ১৪৩৩

ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী-হুথি সংঘর্ষ তীব্র, বাড়ছে মানবিক সংকট

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৫২

শেয়ার

ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী-হুথি সংঘর্ষ তীব্র, বাড়ছে মানবিক সংকট
ছবি সংগৃহীত

ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী ও হুথি যোদ্ধাদের মধ্যে একাধিক রণাঙ্গনে লড়াই তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিতে মানবিক সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। শনিবার সরকারঘেঁষা তুর আল-বাহা সামরিক অক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, লাহিজ প্রদেশের আল-মাকাতিরাহ রণাঙ্গনে ভারী সংঘর্ষে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুগত আট সেনা নিহত হয়েছেন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের কারণে বেসামরিক মানুষের পরিস্থিতিরও অবনতি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে লড়াই বেড়ে যাওয়ার পর থেকে ২ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শুধু তাইজ প্রদেশেই রয়েছেন প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার মানুষ।

তাইজ প্রদেশে সরকারি সেনারা জানিয়েছে, আল-আকরুদ এলাকায় তারা ১২ হুথি যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। তাইজ শহরের উপকণ্ঠে কয়েক দিন ধরে সংঘর্ষ চলছে। সেখানে সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে দিয়েছে এবং গোষ্ঠীটির ব্যাপক ক্ষতি করেছে বলে জানানো হয়েছে।

প্রদেশটির আল-শাকাব রণাঙ্গনেও হুথিদের হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে সরকারি বাহিনী। সরকারপন্থি হোমল্যান্ড শিল্ড ফোর্সেস জানিয়েছে, আল-ওয়াজিয়া এলাকায় ড্রোন হামলা চালিয়ে হুথিদের একটি সরবরাহ যান ধ্বংস করা হয়েছে। অন্যদিকে, সাদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেডস জানিয়েছে, লাহিজ সীমান্তের কাছে আল-মাদারিবায় হুথিদের অবস্থানে নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছে।

আল-জাওফ ও মারিবেও সরকারি সেনা এবং তাদের মিত্র পপুলার রেজিস্ট্যান্স যোদ্ধাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আল-জাওফে হুথিদের সামরিক অবস্থান, ব্যারাক ও সেনা সমাবেশ লক্ষ্য করে কামানের গোলাবর্ষণ এবং ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। জোটের বিমান হুথিদের কমান্ড কেন্দ্র ও সরবরাহ ডিপোতে বোমা হামলা চালিয়েছে। মারিবে হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে সরকারি বাহিনীর কামান ও ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটও হামলা চালিয়েছে।

গত মাসে লোহিত সাগর উপকূলে সরকারপন্থি বাহিনীর কাছ থেকে কৌশলগত ভূখণ্ড দখল করে নেয় হুথিরা। এরপর ইয়েমেনে যুদ্ধের তীব্রতা বেড়েছে। আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত হুথিদের অগ্রযাত্রার জবাবে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। পরে ডন অব ইয়েমেন অভিযান শুরু করা হয়। ইরানপন্থি গোষ্ঠীটির দখলে থাকা ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করা এ অভিযানের লক্ষ্য। এর মধ্যে রাজধানী সানাও রয়েছে, যা ২০১৪ সালে হুথিরা দখল করে।

ড্রোন ও হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার দাবি

ইয়েমেনে আকাশপথেও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, হাজ্জা প্রদেশের আকাশে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী সৌদি আরবের একটি রিকনিসান্স ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোনটি তুরস্কে তৈরি লেন্টাটেক কারায়েল মডেলের। সর্বশেষ উত্তেজনা শুরুর পর এ ধরনের ড্রোনের মধ্যে এটি চতুর্থ ভূপাতিত করার ঘটনা বলে তিনি দাবি করেন।

সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী নাজরান প্রদেশে একটি সৌদি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার দাবিও করেছে হুথিরা। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র কর্নেল তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, নাজরানে কারিগরি ত্রুটির কারণে একটি এএইচ-৬আই রিকনিসান্স হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে দুই ক্রু নিহত হয়েছেন।

এদিকে, হুথি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সাদা প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে সৌদি বিমান ১০টি হামলা চালিয়েছে।

এলএনজি ট্যাংকারে হামলার চেষ্টা

আল-মুকাল্লা উপকূলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) একটি ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও)। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, একটি স্কিফে থাকা অন্তত সাতজন সশস্ত্র ব্যক্তি ট্যাংকারটির দিকে দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ে।

জবাবে জাহাজটির নিরাপত্তা দল দুটি সতর্কতামূলক গুলি ছোড়ে। এরপর হামলাকারীরা গতিপথ পরিবর্তন করে সেখান থেকে সরে যায়।

তাইজের হাসপাতালে জ্বালানি ও ওষুধের সংকট

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে বলেছে, তাইজ শহর কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শহরটির ১২টি হাসপাতালে মাত্র চার দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। অস্ত্রোপচারের সরঞ্জামের সংকটের পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান কলেরা প্রাদুর্ভাবের মধ্যে অক্সিজেন ও ওষুধের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

সংঘাতের প্রভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকট ইয়েমেনের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর নিশ্চিত করেছে, ৪ হাজারের বেশি শরণার্থী পূর্ব আফ্রিকায় পৌঁছেছেন। তাঁদের মধ্যে ৩ হাজার ৮০০ জন জিবুতিতে এবং প্রায় ২০০ জন সোমালিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন।

ইউএনএইচসিআর আরও জানিয়েছে, জিবুতির মারকাজি শরণার্থীশিবিরে কলেরা প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সেখানে স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। শিবিরটিতে ৩১ জন আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।