রবিবার

১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ৩ কার্তিক, ১৪৩৩

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইউরোপের চার দেশে বিক্ষোভ-সহিংসতা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬:১৩

শেয়ার

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইউরোপের চার দেশে বিক্ষোভ-সহিংসতা
ছবি সংগৃহীত

জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ইউরোপের চার দেশ ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে রাজপথে নেমেছেন লাখ লাখ মানুষ। গতকাল শনিবার এসব দেশে বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের সরকার রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার দেশের মধ্যে ফ্রান্সে বিক্ষোভ সবচেয়ে উত্তাল রূপ নেয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন। এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের তীব্র সংঘর্ষ হয়।

কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ছাত্র আন্দোলনের পর বিক্ষোভের মিছিলগুলো দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। সহিংসতায় জড়িত ছোট ছোট গোষ্ঠী সরকারি ভবন, বিলাসবহুল বুটিক ও সুপারমার্কেটে হামলা চালায়। বিভিন্ন স্থানে লুটপাটের পাশাপাশি পুলিশের গাড়ি ও কর্মকর্তাদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটে।

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু জানিয়েছেন, চলমান সংঘাতে ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। মধ্য প্যারিসে মোতায়েন করা পুলিশ সদস্যদের পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেন, ক্ষয়ক্ষতি আরও কম হওয়াটা একটি অলৌকিক ব্যাপার।

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী প্যারিস ছাড়াও মার্সেই, নিস, নান্তেস, বর্দো, লিমোগেস, লিলি, তুলুউজ ও স্ট্রাসবুর্গে অসংখ্য দোকানপাটে লুটপাট চালানো হয়েছে। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোইরে বলেন, রাজধানীর রাস্তাগুলো পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।

লিমোগেস শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে ১৪০ বছরের বেশি পুরোনো টাউন হলটি প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। মার্সেই ও লিলির টাউন হলও ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। লিওঁতে বিক্ষোভকারীরা শহরের প্রধান পর্যটন কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেন।

সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছেন, এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। দায়ীদের বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি করা হবে বলে জানান তিনি।

বেলজিয়াম ও পর্তুগালেও বিক্ষোভ

বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছিল। শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করেন এবং আগুন ধরিয়ে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।

ব্রাসেলসের পূর্বে অবস্থিত তুলনামূলক ছোট শহর লিয়েজেও বিক্ষোভ দমনে জলকামান মোতায়েন করা হয়। তবে এসব বিক্ষোভে ঠিক কত মানুষ অংশ নিয়েছেন, তা জানায়নি পুলিশ।

অন্যদিকে, পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং বড় শহরগুলোতে আবাসন সংকটের প্রতিবাদে ১০ হাজারের বেশি মানুষ মিছিল করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০১৭ সালের পর থেকে পর্তুগালে বাড়ির দাম অর্ধেকেরও বেশি বেড়েছে। নতুন ভাড়ার চুক্তির ক্ষেত্রেও প্রায় সমপরিমাণ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

পর্তুগালের পার্লামেন্ট বিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম গত শুক্রবার বলেছেন, সরকার রাস্তার চিৎকারের কাছে মাথা নত করবে না। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দেশের নেতারা সাধারণ মানুষের সমস্যা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

ইতালির মিলান ও বোলোনিয়ায় সংঘর্ষ

ইতালির মিলানের কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। এ সময় দোকানপাটে লুটপাট ও বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরিস্থিতির কারণে পিয়াজ্জা দেল দুওমো এবং সাধারণত ক্রেতাদের ভিড়ে মুখর থাকা একটি বিলাসবহুল আর্কেড ফাঁকা হয়ে যায়।

যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ মিছিলের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। পরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর ও ইটের টুকরো ছুড়ে মারেন। তাঁরা রাস্তার বারগুলোর টেবিল দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে।

ইতালীয় বার্তা সংস্থা লাপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘর্ষে অন্তত দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। অনেক অপ্রাপ্তবয়স্কসহ প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেন, বিক্ষোভ করা অধিকার, কিন্তু শহরে আগুন জ্বালানো অধিকার নয়। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য যারা বিক্ষোভের সুযোগ নেয়, তাদের বিচারের মুখোমুখি করার কথাও বলেন তিনি।

মিলানের কেন্দ্র-বামপন্থী মেয়র গিউসেপ্পে সালা বলেন, বিক্ষোভের কারণগুলো যুক্তিসংগত। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সহিংসতা এবং শহরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ইতালির বোলোনিয়া শহরেও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের আড়ালে বিক্ষোভকারীদের ইট-পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ হয়।

ফ্রান্সের বাইরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

এইচইসি প্যারিস বিজনেস স্কুলের ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন ও নীতিবিষয়ক অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো আল জাজিরাকে বলেন, অন্য দেশগুলোর বিক্ষোভ ফ্রান্সের মতো বড় আকার ধারণ না করলেও ইউরোপজুড়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ফ্রান্স এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। তবে এখন এমন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে যে আন্দোলনটি দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ছে।

আলেমান্নোর মতে, শনিবারের বিক্ষোভই শেষ নয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন জায়গায় এ ধরনের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে পারে। গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় ইতিমধ্যে আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায় তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর ধারণা, আগামী সপ্তাহে এসব দেশে আরও বড় জনসমাগম হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, একই সময়ে বিভিন্ন দেশে সংঘটিত এসব বিক্ষোভের পেছনে অভিন্ন কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থায় অপর্যাপ্ত অর্থায়ন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের স্নাতক শেষ করার পর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।

এদিকে আগামী ১২ মাসের মধ্যে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। ইউরোপ যখন এই বিশাল নির্বাচনী চক্রের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই বিভিন্ন দেশে গণ-অস্থিরতা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

আলেমান্নো সতর্ক করে বলেন, এসব বিক্ষোভ ও আন্দোলন ইউরোপের আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠতে যাচ্ছে।