ভারতের শিক্ষার্থী আন্দোলনের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরা। চলতি বছরের শুরুতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ থেকে শুরু করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন পর্যন্ত বিভিন্ন ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব দিয়ে আলোচনায় এসেছেন তিনি।
২৯ বছর বয়সী নেহা বোরা ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) পিএইচডি গবেষক। পাশাপাশি তিনি আইসার জাতীয় সভাপতি। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনের মধ্যে গত এক সপ্তাহে দিল্লি পুলিশের হাতে একাধিকবার আটক হওয়া কর্মীদের মধ্যে রয়েছেন তিনিও।
এ ইস্যুতে রাজধানী নয়াদিল্লিতে পৃথক বিক্ষোভ কর্মসূচিতেও নেতৃত্ব দিয়েছেন নেহা। গত সপ্তাহে তাঁর নেতৃত্বে আয়োজিত একটি প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ ও কপিল সিবাল।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে দিল্লির যন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের অনশনেও যোগ দেন নেহা ও অন্য শিক্ষার্থী নেতারা। বিভিন্ন আন্দোলনে ধারাবাহিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ভারতের ছাত্র অধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের অঙ্গনে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি।
আইসা কী, ছাত্ররাজনীতিতে এর ভূমিকা কী
১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা) ভারতের একটি বামপন্থী ছাত্রসংগঠন। এটি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) লিবারেশন বা সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন হিসেবে পরিচিত। শিক্ষা, শিক্ষার্থীদের অধিকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সংগঠনটি ভারতের ছাত্ররাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।
ভারতের বামপন্থী ছাত্ররাজনীতিতে আইসার উত্থান বুঝতে হলে দেশটির কমিউনিস্ট আন্দোলনের ধারাবাহিকতার দিকে নজর দিতে হয়। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই)। পরে ১৯৩৬ সালে দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন (এআইএসএফ) গড়ে ওঠে। ১৯৬৪ সালে সিপিআই ভেঙে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী) বা সিপিআই(এম) প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৭০ সালে গঠিত হয় স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (এসএফআই)।
তবে আইসার রাজনৈতিক শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভারতের নকশাল আন্দোলনও।
১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়িতে কৃষক বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে এ আন্দোলনের বিস্তার ঘটে। চারু মজুমদার ও কানু সান্যালসহ সিপিআই(এম)-এর বিদ্রোহী নেতারা সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেন। ১৯৬৯ সালে গঠিত হয় কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী), সংক্ষেপে সিপিআই(এমএল)। পরে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও অন্ধ্র প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
সরকারি দমন-পীড়ন ও মতাদর্শগত বিরোধের কারণে ১৯৭০-এর দশকে নকশাল আন্দোলন বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। দক্ষিণ দেশ, পিপলস ওয়ার গ্রুপ (পিডব্লিউজি), পার্টি ইউনিটি এবং সিপিআই(এমএল) লিবারেশন ছিল এসব ধারার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
এর মধ্যে কয়েকটি গোষ্ঠী সশস্ত্র সংগ্রাম অব্যাহত রাখে। তাদের কৌশল ছিল গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটি গড়ে সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে শহর ঘেরাও করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা। অন্যদিকে, সিপিআই(এমএল) লিবারেশন ধীরে ধীরে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ থেকে সরে এসে গণআন্দোলন ও নির্বাচনি রাজনীতিতে অংশগ্রহণের দিকে এগোয়।
১৯৮২ সালে দলটি ইন্ডিয়ান পিপলস ফ্রন্টের ব্যানারে নির্বাচনি রাজনীতিতে অংশ নিতে শুরু করে। ১৯৮৯ সালে বিহারের আরা আসন থেকে রামেশ্বর প্রসাদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে সিপিআই(এমএল) লিবারেশন বিহারে বিরোধী দলগুলোর ইন্ডিয়া জোটের অংশ।
এই রাজনৈতিক ধারার ছাত্রসংগঠন হিসেবে ১৯৯০ সালে আইসার যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে সংগঠনটি শিক্ষার্থীদের অধিকার, শিক্ষা খাতে বৈষম্য এবং বিভিন্ন জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুতে আন্দোলনে অংশ নেয়। সংগঠনটির সভাপতি নেহা বোরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ এবং ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে আলোচনায় এসেছেন।
আরও পড়ুন:







