শুক্রবার

১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১ কার্তিক, ১৪৩৩

বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আল-জাজিরার সাংবাদিকদের ডিভাইসে নজরদারি সফটওয়্যার

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:১৫

শেয়ার

বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আল-জাজিরার সাংবাদিকদের ডিভাইসে নজরদারি সফটওয়্যার
ছবি সংগৃহীত

ইসরাইলি বিজ্ঞাপনপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডিসকভার-টেকের সহায়তায় আল-জাজিরা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবহৃত অসংখ্য ডিভাইসে গোপনে নজরদারির ক্ষতিকর সফটওয়্যার স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত নথি, ই-মেইল, বার্তা ও ব্রাউজারের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। এমনকি ব্যবহারকারীর অজান্তে মাইক্রোফোন ও ওয়েবক্যামের মাধ্যমেও তথ্য নেওয়া যায়। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ডিভাইসগুলোতে সফটওয়্যারটি প্রবেশ করানো হয়েছে, যেখানে ব্যবহারকারীদের কোনো লিংকে ক্লিক করতে হয়নি।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক তদন্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিটিজেন ল্যাব।

আল-জাজিরার নিজস্ব তদন্তের সূত্র ধরে এ অনুসন্ধান চালানো হয়। এতে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ইসরাইলি নজরদারি সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ক্যান্ডিরুর তৈরি ক্ষতিকর সফটওয়্যার আক্রান্ত ডিভাইসগুলোতে স্থাপন করা হয়েছিল। ক্ষতিকর সাইবার কার্যক্রমের অভিযোগে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ক্যান্ডিরুকে কালো তালিকাভুক্ত করে।

আল-জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তাদের কয়েকজন কর্মীর ওপর এ ধরনের নজরদারি হামলার নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে কর্মী ও প্রযুক্তিব্যবস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের মতে, সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। এ ঘটনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনারও আহ্বান জানিয়েছে তারা।

বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জিরো-ক্লিক হামলা

সিটিজেন ল্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসকভার-টেক নজরদারির সফটওয়্যারযুক্ত বিজ্ঞাপন কিনেছিল। পরে ওই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ডিভাইসগুলোতে ক্যান্ডিরুর তৈরি ক্ষতিকর সফটওয়্যার প্রবেশ করানো হয়। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক হামলার এটিই প্রথম শনাক্ত হওয়া ঘটনা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ পদ্ধতিকে বলা হয় জিরো-ক্লিক হামলা। এতে ব্যবহারকারীকে কোনো লিংকে ক্লিক করতে বা ফাইল ডাউনলোড করতে হয় না। আক্রান্ত বিজ্ঞাপনটি ডিভাইসে প্রদর্শিত হলেই তাতে ক্ষতিকর সফটওয়্যার প্রবেশ করতে পারে।

ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও গোপন নজরদারি

সফটওয়্যারটি ডিভাইসে থাকা বিভিন্ন ধরনের সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ফাইল, নথিপত্র, ব্রাউজারের কুকি, বুকমার্ক ও সংরক্ষিত প্রবেশসংক্রান্ত তথ্য। এ ছাড়া ব্যবহারকারী কিবোর্ডে কী লিখছেন, তা রেকর্ড করা, পর্দার ছবি তোলা এবং মাইক্রোফোন ও ওয়েবক্যামের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করাও সম্ভব। জনপ্রিয় যোগাযোগমাধ্যমে থাকা ই-মেইল ও বার্তাও হাতিয়ে নিতে পারে সফটওয়্যারটি।

নজরদারির বিষয়টি যাতে সহজে শনাক্ত করা না যায়, সে জন্য সফটওয়্যারটি এনক্রিপ্ট করা যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে। সংগৃহীত তথ্য ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বিভিন্ন সময়ে পাঠানো হয়। এতে নিরাপত্তাব্যবস্থার নজর এড়িয়ে তথ্য পাচার করা সহজ হয়। ব্যবহৃত নির্দিষ্ট নজরদারি প্রযুক্তিটির দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ক্যান্ডিরুর মতো প্রতিষ্ঠানের তৈরি প্রযুক্তি এবং সেগুলোর গ্রাহকেরা আধুনিক সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার জটিল কৌশল ব্যবহার করছে। আল-জাজিরার সাংবাদিকদের পাশাপাশি আরও বহু মানুষের ডিভাইস এ হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রতিবেদন করা কয়েকজন সাংবাদিকও রয়েছেন।

২০২৪ সালে প্রথম অস্বাভাবিক কার্যক্রম শনাক্ত

আল-জাজিরার নিজস্ব প্রযুক্তি দল ২০২৪ সালে প্রথম কয়েকজন সাংবাদিকের ব্যবহৃত ডিভাইসে অস্বাভাবিক কার্যক্রম শনাক্ত করে। ২০২৫ সালেও এ ধরনের কার্যক্রম চলতে থাকে। এসব ঘটনার পেছনে নজরদারির সফটওয়্যার থাকার সন্দেহ থেকে বিস্তারিত তদন্তের জন্য সিটিজেন ল্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করে আল-জাজিরা।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে সিটিজেন ল্যাব জানায়, হামলার সময় আল-জাজিরার সংগ্রহ করা নেটওয়ার্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে হামলাটি কীভাবে চালানো হয়েছিল, তার একটি স্পষ্ট সময়ভিত্তিক চিত্র পাওয়া গেছে।

আল-জাজিরা জানিয়েছে, সিটিজেন ল্যাবের সঙ্গে সহযোগিতার ফলে হামলাগুলো যাচাই করা এবং সেগুলো সম্পর্কে জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে।

পেন্টাগন ও আন্তর্জাতিক সংস্থার নেটওয়ার্কেও বিজ্ঞাপন

এদিকে নিউইয়র্কভিত্তিক বিজ্ঞাপন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান কনফিয়্যান্টের পৃথক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসকভার-টেকের কিছু বিজ্ঞাপন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্কেও দেখা গেছে।

ক্যান্ডিরুর তৈরি নজরদারির সফটওয়্যার এর আগেও বিভিন্ন দেশে সাংবাদিক, ভিন্নমতাবলম্বী ও অন্য ব্যক্তিদের ওপর নজরদারিতে ব্যবহার করা হয়েছে। এ ধরনের নজরদারির শিকার হয়েছেন অন্তত ১০০ জন।