যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বিপুল সামরিক সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে সৌদি আরব। সাম্প্রতিক হামলায় দেশটির বিমানবন্দরে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তার কারণে বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের ঘরে বসে কাজ করতে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে হামলা প্রতিরোধের উপায় খোঁজার পাশাপাশি পাল্টা আঘাত হানলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকিও বিবেচনা করছে রিয়াদ।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় তুলনামূলক দুর্বল সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত হুতিরা এখন শক্তিশালী লড়াকু বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে ফেলছে। এতে আরব উপদ্বীপে আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইয়েমেনে হুতিবিরোধী সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দেয় সৌদি আরব। এ কারণেই দেশটিকে লক্ষ্যবস্তু করছে গোষ্ঠীটি।
শনিবারের হামলার পর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজে যাত্রীদের আশ্রয় নিতে দেখা যায়। ফুটেজে বিমানবন্দরের একটি অংশ ধোঁয়ায় ঢেকে যেতেও দেখা গেছে।
বিপুল অস্ত্রেও কেন হামলা প্রতিরোধে দুর্বলতা
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মোট অস্ত্র রপ্তানির ১২ শতাংশ পেয়েছে দেশটি।
বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উন্নত রাডার ও আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছে সৌদি আরব। দেশটির ২০২৬ সালের বাজেটে সামরিক খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। চলতি বছরের শুরুতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ৯০০ কোটি ডলারে ৭৩০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তিও করেছে রিয়াদ।
তবে বিপুল অস্ত্রভান্ডার থাকলেই সব হামলা ঠেকানো সম্ভব নয়। আয়তনে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের প্রায় তিন গুণ। দেশটির বিস্তীর্ণ ও তুলনামূলক জনবিরল এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে জ্বালানি অবকাঠামো, বেসামরিক স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটি। ইয়েমেনের সঙ্গে সৌদি আরবের সীমান্ত প্রায় ১ হাজার ২৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর বড় অংশ দুর্গম মরুভূমির মধ্য দিয়ে গেছে।
সৌদি বিশ্লেষক আলি শিহাবি সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, সৌদি আরবের মতো বিশাল দেশের দিকে ছোড়া প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই শতভাগ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
কমছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত
আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের বরাতে এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার অস্ত্রের মজুত কমে আসছে। এ কারণে মিত্র দেশগুলোর কাছেও সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ।
সম্প্রতি পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে সৌদি আরব। তবে এখন পর্যন্ত দেশ দুটি কার্যত পরিস্থিতি থেকে দূরে রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যৌথ হামলায় ওয়াশিংটনের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন।
লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ এনবিসি নিউজকে বলেন, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে অসম যুদ্ধকৌশলে দক্ষতা অর্জন করেছে হুতিরা। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিজ্ঞতাও তাদের রয়েছে। এসব কৌশল ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের রাডার ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে শিখেছে তারা।
পাল্টা হামলা চালাবে কি সৌদি আরব
সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি বেসামরিক স্থাপনা, বিশেষ করে বিমানবন্দরে হুতিদের হামলাকে যুদ্ধের কৌশলে বড় পরিবর্তন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তার মতে, হুতিদের হামলার জবাব দিতে সৌদি আরবকে বিমান হামলা ও সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহায়তা নেওয়ার কথা বিবেচনা করতে হতে পারে। তবে লড়াই যাতে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ না নেয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক হস্তক্ষেপের সময় হুতিদের সদস্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ হাজার। ২০২৪ সাল নাগাদ তা বেড়ে ৩ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছায়। হুতি ও ইরান একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশল ও নতুন অভিজ্ঞতা বিনিময় করে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমির মতে, সাম্প্রতিক সাফল্যের কারণে হুতিরা নিজেদের প্রায় অপ্রতিরোধ্য মনে করছে। তবে এর জবাবে সৌদি আরবের বড় ধরনের পাল্টা হামলার আশঙ্কাও বাড়ছে।
সূত্র: রয়টার্স, এনবিসি নিউজ ও সিএনএন।
আরও পড়ুন:







