সোমবার

১২ অক্টোবর, ২০২৬ ২৭ আশ্বিন, ১৪৩৩

যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ, উত্তেজনা বাড়ছে দিল্লিতে

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:৫৫

শেয়ার

যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ, উত্তেজনা বাড়ছে দিল্লিতে
ছবি সংগৃহীত

ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে বিতর্কের জেরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরালো হচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) রাজপথে সক্রিয় রয়েছে। বিক্ষোভকারীদের আটক, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চলাচলে বিধিনিষেধ এবং যন্তর মন্তরকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় দিল্লিতে উত্তেজনা বেড়েছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) বিরোধী দলগুলোর সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে পদযাত্রা এবং সিজেপির নতুন বিক্ষোভের সময় ও স্থান নির্ধারণের উদ্যোগে পরিস্থিতি আরও আলোচনায় আসে। সিজেপির দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ করতে হবে এবং ভোটার তালিকা সংশোধনপ্রক্রিয়া স্থগিত করতে হবে।

ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ১৩ কোটির বেশি নাম

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে গত বছর শুরু হওয়া ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। এ প্রক্রিয়ায় ভারতের ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে। বাদ পড়া নামগুলোর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ব্যক্তি, ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত ব্যক্তি এবং ৩ কোটি এমন ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।

নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা, মৃত ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া এবং ঠিকানা পরিবর্তনের তথ্য সংশোধন করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য। ভুলবশত কারও নাম বাদ পড়লে পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছে কমিশন।

তবে বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নামও বাদ পড়তে পারে। তাদের আশঙ্কা, মুসলিমসহ সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বিরোধীদের দাবি, ভোটার তালিকার এ পরিবর্তন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

যন্তর মন্তর বাদ, নতুন প্রতিবাদস্থল নিয়ে প্রশ্ন

দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচির পরিচিত স্থান। সরকারি আদেশে এটিকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে তিনটি নতুন স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সিজেপি প্রশ্ন তুলেছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যন্তর মন্তরকে ভয় পাচ্ছেন কেন। দলটির বক্তব্য, যন্তর মন্তর জনগণের জায়গা। এটি প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জনগণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষ বা সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছে তারা।

সিজেপি এ সিদ্ধান্তকে অগ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে বলেছে, এটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও প্রতিবাদের মৌলিক অধিকারের ওপর আঘাত। দলটির বিবৃতিতে সতর্ক করা হয়েছে, জনগণের প্রতিবাদস্থল বন্ধ করতে থাকলে একসময় গণতন্ত্রকেও বাতিল করে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাদের হিন্দি স্লোগান, ‘এখন পুরো দেশই যন্তর মন্তর হয়ে উঠছে’, আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপি ও তাদের সমর্থকেরা যন্তর মন্তরে কয়েক সপ্তাহ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছিলেন।

বিক্ষোভে আটক হাজারো, মুক্তি পেয়েছেন সিজেপির নেতারা

ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরুদ্ধে গত শনিবার (১০ অক্টোবর) বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। ২৫ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়। বিক্ষোভে যোগ দিতে আসা অনেককে কর্মসূচিস্থলে পৌঁছানোর আগেই আটক করা হয়। ওই দিন সাত হাজারের বেশি মানুষকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল।

আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, অশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাস। পরে রোববার ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়। তবে এক বছরের মধ্যে শান্তিভঙ্গ না করার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। মুক্তির পর আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন দলটির নেতারা।

বিক্ষোভকারীদের কয়েকজন পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার, শারীরিক নির্যাতন এবং অস্বস্তিকর পরিবেশে আটকে রাখার অভিযোগ তুলেছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে কর্তৃপক্ষ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

সোমবারও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। নিরাপত্তার কারণে দিল্লির ছয়টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। ২০টির বেশি সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও পথ পরিবর্তনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেডের পাশাপাশি দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামসহ নিরাপত্তাকর্মীদের অবস্থান বজায় ছিল।

সিজেপির ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম

সোমবার সিজেপির নেতারা পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় গিয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জন্য নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় চাওয়ার উদ্যোগ নেন। দলটির মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান, তাঁরা বিষয়টি পুলিশের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। তবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সময় নির্ধারণ করা না হলে নিজেরাই নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।

সিজেপির মূল দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন স্থগিত করা। দলটির নেতাদের বক্তব্য, বিষয়টি শুধু একজন নির্বাচন কমিশনারের পদে থাকা বা না-থাকার প্রশ্ন নয়; ভোটাধিকার ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও জড়িত।

সরকারি স্কুলের অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো বিষয়েও সাম্প্রতিক সময়ে আন্দোলন করেছে সিজেপি। ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কে সংগঠনটি এখন বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে একই দাবিতে রাজপথে সক্রিয়।

সুপ্রিম কোর্টের পথে বিরোধীরা, বৈঠকে রাজি নন প্রধান বিচারপতি

সোমবার কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে উদ্বেগ জানাতে সুপ্রিম কোর্টের দিকে পদযাত্রা শুরু করে। ভারতের প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

তবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি হননি। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে আলাদা আলোচনা বিচারিক নীতি ও শিষ্টাচারের পরিপন্থী হতে পারে। তিনি বিরোধীদের আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করার পরামর্শ দেন।

এর আগে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর দিল্লিতে মেট্রো ও ইন্টারনেট পরিষেবা পুনরায় চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে সোমবার নিরাপত্তাজনিত কারণে নতুন করে ছয়টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়।

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও বিতর্ক

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দুই সহকর্মী ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধনপ্রক্রিয়া এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার কিছু বিষয় নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।

বিরোধীদের অভিযোগ, সংশোধনপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। ভুলভাবে নাম বাদ পড়লে ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা করছে।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ভিন্নমত থাকা অস্বাভাবিক নয় এবং সিদ্ধান্তগুলো কমিশনের সম্মিলিত প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে। বিজেপিও ভোটার তালিকা সংশোধনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

সামনে কী হতে পারে

দিল্লিতে এখন কয়েকটি বিষয়ের দিকে নজর থাকবে। প্রথমত, সিজেপির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জন্য নির্দিষ্ট সময় ও স্থান নির্ধারণ করে কি না। দ্বিতীয়ত, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনুমতি বা সময়সূচি না পেলে সংগঠনটি কী কর্মসূচি ঘোষণা করে। তৃতীয়ত, বিরোধী দলগুলো সুপ্রিম কোর্টে আনুষ্ঠানিক আবেদন করে কি না।

পাশাপাশি ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আদালতের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রতিবাদস্থল নির্ধারণ, আটক অভিযান এবং বিরোধীদের আদালত অভিমুখে পদযাত্রা ঘিরে দিল্লিতে রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

তবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া সব নাম বেআইনিভাবে মুছে ফেলা হয়েছে, এমনটি এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একইভাবে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগও নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি অস্বীকার করেছে।

সূত্র: দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।