রবিবার

১১ অক্টোবর, ২০২৬ ২৬ আশ্বিন, ১৪৩৩

মিয়ানমারে তরুণদের অপহরণ করে সেনাবাহিনীতে ‘বিক্রি’

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:১৬

শেয়ার

মিয়ানমারে তরুণদের অপহরণ করে সেনাবাহিনীতে ‘বিক্রি’
ছবি সংগৃহীত

মিয়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলীয় কারেন রাজ্যের রাজধানী পা-আন শহরে সন্ধ্যার পর রাস্তায় তরুণদের উপস্থিতি কমে গেছে। অপহৃত হয়ে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগের ভয়ে কয়েক মাস ধরে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন দেশটির তরুণেরা।

২৬ বছর বয়সী টুকটুকচালক জাও মিন (ছদ্মনাম) বলেন, কাজের প্রয়োজনে তাঁকে বাইরে বের হতে হয়। এ কারণে পরিবার থেকে নিয়মিত ফোন করে সাবধানে চলাফেরা করতে এবং দূরে না যেতে বলা হয়। তাঁর পরিচিত কয়েকজনকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সামরিক জান্তার লোকজন ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের ধরে নিয়ে জোর করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দিচ্ছে। তিন বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে বিদ্রোহী ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে বিস্তীর্ণ এলাকা হারানোর পর সেনাসংকটে পড়ে জান্তা সরকার। এরপর ২৪ থেকে ৩৫ বছর বয়সী পুরুষদের জন্য অন্তত দুই বছরের সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক করে আইন পাস করা হয়।

আইনটি কার্যকর হওয়ার পর সেনা সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় মানব পাচার ও আধুনিক দাসত্বের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মিয়ানমার ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের (এমডিএসআই) সামরিক বিষয়ক কর্মকর্তা ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা নাউং ইয়ো বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী তরুণদের গতিবিধির ওপর নজর রাখছে। তাদের গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। আটক রাখার ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় এবং তল্লাশির নামে অপহরণের ঘটনাও ঘটছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির বর্মি সংস্করণের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি নিখোঁজ ব্যক্তির সংখ্যা রেকর্ড হারে বেড়েছে। তথ্য অনুসন্ধানী সংস্থা মিয়ানমার উইটনেস জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান চেয়ে দেওয়া বিজ্ঞাপনের সংখ্যা সূচকীয় হারে বেড়েছে। এসব বিজ্ঞাপনের বড় অংশেই তরুণদের নিখোঁজ হওয়ার তথ্য রয়েছে।

সেনা নিয়োগের কোটা পূরণে অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তর

এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন ইয়াঙ্গুনের বাসিন্দা মো সান প্যানের স্বামী পিয়ো ওয়াই। গত বছর তাঁকে ধরে নিয়ে সেনা নিয়োগের কোটা পূরণের জন্য এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডের কাছে চার লাখ কিয়াটে (৯০০ ডলার) বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তাঁর স্ত্রী।

স্বামীকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে স্বজনদের সহায়তা নিয়েও প্রতারিত হন মো সান প্যান। এতে তাঁর ৪ লাখ ৫০ হাজার কিয়াট ক্ষতি হয়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, স্বাভাবিক নিয়মে আইন মেনে তাঁর স্বামীকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হলে তিনি তা মেনে নিতেন। কিন্তু তাঁদের নিজস্ব প্রশাসনিক কার্যালয় তাঁর স্বামীকে অন্য জায়গায় বিক্রি করে দিয়েছে, এটি তিনি মেনে নিতে পারছেন না। পুলিশ তাঁর অভিযোগ গ্রহণ করলেও মানব পাচারের মামলা করতে দেয়নি বলে জানান তিনি।

অভিযোগ অনুযায়ী, যেসব সচ্ছল তরুণ বা পরিবার অর্থ দিয়ে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা এড়াতে চায়, তাদের পরিবর্তে দরিদ্র ও অসহায় তরুণদের নিয়োগের জন্য বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে আইনটির প্রভাব মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপরই বেশি পড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রতি মাসে নির্দিষ্টসংখ্যক সেনা সংগ্রহের চাপ এবং স্থানীয় পর্যায়ে আর্থিক লাভের সুযোগ অপহরণ ও অর্থের বিনিময়ে তরুণদের হস্তান্তরের চক্রকে উৎসাহিত করছে।

সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. সন্দীপ সিং বলেন, বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের কঠোর নীতি জান্তার বেসামাল ও অসহায় অবস্থানকে স্পষ্ট করে তুলছে।

এমডিএসআই এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সামরিক আইন ব্যবহার করে জান্তা জেনারেলরা সাধারণ নাগরিকদের একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করছেন। বছরের পর বছর নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া মিয়ানমার সেনাবাহিনী বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার আইনকে দমন-পীড়নের আরেকটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

সূত্র: বিবিসি