ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচি পণ্ড করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন বহুমুখী নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে।
ধ্রুব রাঠি ও সিজেপি নেতাদের আটক
আন্দোলনে যোগ দেওয়া ঠেকাতে শুরু থেকেই কঠোর ভূমিকা নেয় পুলিশ। গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬-এর কেন্দ্রীয় বিহার আবাসন সমিতিতে নিজের বাসভবন থেকে দিল্লির প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিতে যাওয়ার সময় পুলিশের নির্দেশনা অমান্য করার অভিযোগে জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে আটক করা হয়। এর আগে একই দিন সকালে সিজেপির আইনি বিভাগের প্রধান রত্না সিংকেও নিজ বাসা থেকে আটক করে পুলিশ।
দিল্লির যন্তর মন্তরে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দিতে মুম্বাই থেকে আসা সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেসহ দুই জ্যেষ্ঠ সদস্যকে উড়োজাহাজের ভেতর থেকেই আটক করে দিল্লি পুলিশ। দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানটি অবতরণের পরপরই রানওয়েতে থাকা অবস্থায় পুলিশ ভেতরে প্রবেশ করে তাকে আটক করে।
উড়োজাহাজের ভেতরে চলা উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সময় অভিজিৎ দীপকে নিজের ইনস্টাগ্রাম থেকে সরাসরি সম্প্রচার করে পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।
সিজেপির পক্ষ থেকে একে আন্দোলন পঙ্গু করার ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তাদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করা হয়েছে।
রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা বলয়
দেশটির রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে ২০ হাজারেরও বেশি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষভাবে সংবেদনশীল এলাকা যেমন যন্তর মন্তর, জনপথ, নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর নিয়ে গঠিত দেড় কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় সাড়ে ছয় হাজারের বেশি অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
আন্দোলনের বিস্তার ও পরিকল্পনা ঠেকাতে কঠোর প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাত ১০টা থেকে যন্তর মন্তর ও এর চারপাশের চার কিলোমিটার এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা শনিবার (১০ অক্টোবর) রাত ১০টা পর্যন্ত বলবৎ রাখার ঘোষণা দেয় কর্তৃপক্ষ।
রাজধানী ও আশপাশের রাজ্য থেকে লোকজনের সমাগম ঠেকাতে নয়াদিল্লির ৪৫টি মেট্রো স্টেশন পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২৫০টি দূরপাল্লার ও লোকাল ট্রেন বাতিল করা হয়।
বিক্ষোভস্থলে বহুস্তরীয় ব্যারিকেড
বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা বহুস্তরীয় করা হয়েছে। সেখানে যাওয়ার প্রধান সড়কগুলোতে অন্তত সাত স্তরের ব্যারিকেড রয়েছে। এমনকি শেষ দিকের কয়েকটি স্তর ভেঙে ফেলা বা পার হওয়া কঠিন করতে ঝালাই করে, জোড়া লাগানোর ব্যবস্থা করা হয়।
এছাড়া, নয়াদিল্লি ও মধ্য দিল্লির বিভিন্ন লজ, হোটেল এবং এয়ারবিএনবির মাধ্যমে বাসা ভাড়া দেওয়া সম্পত্তিগুলোতে পুলিশ তল্লাশি চালায়। হোটেল ও সম্পত্তি মালিকদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী বা সমাগম করতে ইচ্ছুক কোনো ব্যক্তিকে রুম বা বাসা ভাড়া না দেয়।
নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং যেকোনো বিশৃঙ্খলা এড়াতে সংবেদনশীল স্থানগুলোতে অডিও রেকর্ডিং সুবিধাসহ ৩০০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভসংক্রান্ত পোস্ট ও বার্তাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ২০০ জনেরও বেশি কনটেন্ট নির্মাতা পুলিশের সরাসরি নজরদারিতে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ক্যামেরাবন্দি ও সতর্কতা প্রচার
পুলিশের বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা অসদাচরণের অভিযোগ মোকাবিলায় এবার প্রতিটি ঘটনা ক্যামেরাবন্দি করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারসহ দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বডি ক্যামেরা প্রদান করা হয়। এ ছাড়া শত শত আলোকচিত্রী ও ভিডিওগ্রাফার নিয়োগ করা হয়েছে। যেন, ঘটনার সঠিক ধারাবাহিকতা ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ সংরক্ষণ করা যায়।
সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে লাউডস্পিকারের মাধ্যমে রেকর্ড করা ঘোষণা প্রচার করা হয় বারবার। জমায়েত না হওয়া, স্লোগান না দেওয়া, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি না করা এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা না চালানোর আহ্বান জানানো হয় এ সময়। একই সঙ্গে কমিউনিটি সেন্টার, মসজিদ ও আবাসিক কল্যাণ সমিতিগুলোকে বিক্ষোভের অনুমতি না থাকার বিষয়টি প্রচার করতে বলা হয়েছে।
রাতভর চিরুনি অভিযান
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দিল্লি পুলিশ রাতভর দেশটির রাজধানীজুড়ে চিরুনি অভিযান চালিয়েছে। এই অভিযানে বিভিন্ন স্থান থেকে কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক সন্দেহভাজন আন্দোলনকারী ও বিক্ষোভে যোগ দিতে আসা ব্যক্তিকে আটক করা হয়। সবমিলিয়ে এসব পরিস্থিতিতে অনেকটাই চাপে পড়েছে বর্তমান মোদি সরকার। জনপ্রিয় ইউটিউবার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ধ্রুব রাঠিকে গ্রেপ্তার করায় মোদির বিজেপি সরকারের ওপর আরো চাপ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:







