শুক্রবার

৯ অক্টোবর, ২০২৬ ২৪ আশ্বিন, ১৪৩৩

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বিপাকে হাজারো ভারতীয় প্রযুক্তি পেশাজীবী

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:২২

শেয়ার

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বিপাকে হাজারো ভারতীয় প্রযুক্তি পেশাজীবী
ছবি সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি কর্মীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার পথ সংকুচিত করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন কর্মীদের চাকরি ও মজুরি সুরক্ষার যুক্তিতে আটটি বড় প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী শ্রম সার্টিফিকেশন (পিইআরএম) কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এতে হাজার হাজার ভারতীয় প্রযুক্তি পেশাজীবী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অ্যাডোবি, কগনিজেন্ট, এইচসিএল ও ক্যাপজেমিনির নাম রয়েছে। মার্কিন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের নতুন পিইআরএম আবেদন গ্রহণ করা হবে না। আগে জমা দেওয়া যেসব আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, সেগুলোর কার্যক্রমও স্থগিত থাকবে।

বৃহস্পতিবার মার্কিন শ্রমসচিব কিথ সান্ডারলিং এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও অ্যান্টি-ফ্রড টাস্ক ফোর্সের প্রধান।

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি কর্মী নিয়োগের ভিসাব্যবস্থার অপব্যবহার করে মার্কিন নাগরিকদের চাকরির সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। তবে এ সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠানগুলোর সব ধরনের কাজের ভিসা বাতিল করা হয়নি। স্থগিত করা হয়েছে গ্রিন কার্ড পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় স্থায়ী শ্রম সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া।

সান্ডারলিংয়ের দাবি, ২০০৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ৩০ লাখ বিদেশি কর্মী নিয়োগের আবেদন করেছে। এ সময়ে তারা ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি এইচ-১বি ভিসার অনুমোদন এবং ১ লাখের বেশি স্থায়ী শ্রম সার্টিফিকেশন পেয়েছে।

পিইআরএম হলো যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োগকর্তার মাধ্যমে বিদেশি কর্মীদের গ্রিন কার্ড পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এ প্রক্রিয়ায় সাধারণত নিয়োগকর্তাকে প্রমাণ করতে হয়, সংশ্লিষ্ট পদে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত যোগ্য মার্কিন কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না।

এইচ-১বি ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে কাজ শুরু করা অনেক ভারতীয় প্রযুক্তি পেশাজীবী স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য নিয়োগকর্তার স্পন্সর করা গ্রিন কার্ডের ওপর নির্ভর করেন। ফলে পিইআরএম প্রক্রিয়া স্থগিত হওয়ায় তাঁদের স্থায়ী বসবাসের আবেদন এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হতে পারে। তবে এতে তাঁদের বর্তমান এইচ-১বি ভিসার বৈধতা সরাসরি বাতিল হচ্ছে না।

মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে ভ্যান্সের অভিযোগ

বিদেশি কর্মী নিয়োগের ভিসাব্যবস্থার অপব্যবহারের অভিযোগে মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে বিশেষভাবে সরব হয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর অভিযোগ, মার্কিন কর্মীদের ছাঁটাই করার পর একই ধরনের পদে বিদেশি কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে তাঁদের প্রতিস্থাপন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ভ্যান্সের দাবি, ২০২৫ সালে মাইক্রোসফট প্রায় ৬ হাজার মার্কিন কর্মীকে চাকরিচ্যুত করলেও একই সময়ে বিপুলসংখ্যক এইচ-১বি ভিসার অনুমোদন পেয়েছে এবং হাজার হাজার পিইআরএম আবেদন জমা দিয়েছে। এসব আবেদনের প্রায় ১ হাজার ছিল ছাঁটাই হওয়া মার্কিন কর্মীদের একই ধরনের পদের বিপরীতে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মার্কিন শ্রমবাজারে বিদেশি কর্মীদের প্রভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ভ্যান্স এইচ-১বি ভিসায় নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের ‘বিদেশি চুক্তিবদ্ধ চাকর’ বলে অভিহিত করেন। এ ধরনের ভিসা ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘ভিসা মিল’ বলেও আক্রমণ করেন তিনি।

ভ্যান্সের ভাষ্য, বিদেশি কর্মী নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট পদে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় কর্মীদের সুযোগ দিতে হয়। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠান ছোট শহরের সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে পরে দাবি করে, যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি। এভাবে মার্কিন কর্মীদের বাদ দিয়ে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধেও তদন্ত

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বিদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহৃত ভিসা কর্মসূচি নিয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। জে-১ বিনিময়-ভিজিটর ভিসার মাধ্যমে বিদেশি গবেষকদের স্পন্সর করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভ্যান্স।

তাঁর অভিযোগ, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের কাজে লাগিয়ে মার্কিন স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মজুরি কমিয়ে দিচ্ছে। এ বিষয়ে হার্ভার্ড, ইয়েল ও স্ট্যানফোর্ডসহ নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।

ভ্যান্সের মতে, দক্ষ বিদেশি কর্মীদের কাজের সুযোগ দেওয়ার জন্য তৈরি ভিসাব্যবস্থা মার্কিন কর্মীদের মজুরি কমানোর হাতিয়ার হতে পারে না। তাঁর দাবি, এ ধরনের চর্চা স্থানীয় কর্মীদের স্বার্থ ও জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

পিইআরএম ও এইচ-১বি ভিসার পার্থক্য

আগের কাগজভিত্তিক ‘এলিয়েন এমপ্লয়মেন্ট সার্টিফিকেশন’ কর্মসূচির দীর্ঘ প্রক্রিয়াকরণের সময় কমাতে ২০০৫ সালে পিইআরএম চালু করা হয়। এর আওতায় মার্কিন শ্রম বিভাগ নিয়োগকর্তাদের বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের জন্য স্পন্সর করার প্রক্রিয়া শুরু করার সুযোগ দেয়।

এ প্রক্রিয়ায় শ্রম বিভাগকে ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসকে সার্টিফিকেট দিতে হয় যে নির্দিষ্ট চাকরির জন্য পর্যাপ্ত যোগ্য মার্কিন কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না এবং বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলে একই ধরনের কাজে নিয়োজিত মার্কিন কর্মীদের মজুরি ও কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

অন্যদিকে, এইচ-১বি একটি অস্থায়ী কাজের ভিসা, যার মাধ্যমে দক্ষ বিদেশি কর্মীরা সাধারণত সর্বোচ্চ ছয় বছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করতে পারেন। পিইআরএম হলো স্থায়ী বসবাসের জন্য গ্রিন কার্ড পাওয়ার পথে একটি শ্রম সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া।

পিইআরএম স্থগিত থাকলে বিদেশি কর্মীদের জন্য নিয়োগকর্তার স্পন্সরশিপে গ্রিন কার্ড পাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে অসাধারণ প্রতিভাধর ব্যক্তিদের জন্য ইবি-১এ এবং ইবি-২ ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট ওয়েভারের মতো বিকল্প পথ রয়েছে। এসব আবেদনেও দীর্ঘ অপেক্ষার মুখে পড়তে হতে পারে।

ভারতীয় প্রযুক্তি খাতের প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের পর ভারতের প্রযুক্তি খাতের সংগঠন নাসকম জানিয়েছে, ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক বছরে এইচ-১বি ভিসার ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।

সংগঠনটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অভিবাসন ও দক্ষ কর্মীদের আন্তর্জাতিক চলাচল দুটি আলাদা বিষয়। তাই এগুলোকে একইভাবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

নাসকমের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পমেয়াদি দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণে এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে এবং ভবিষ্যতেও এর প্রয়োজন থাকবে।

সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয়ভাবে কর্মী নিয়োগ বাড়িয়েছে এবং নিজস্ব কর্মীবাহিনী গড়ে তুলেছে। দেশটির ফরচুন ৫০০ তালিকাভুক্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে বলে দাবি করেছে নাসকম।

মার্কিন সেন্সাসের তথ্যভিত্তিক সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা ৫২ লাখের বেশি।

এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত দক্ষ বিদেশি কর্মীদের নতুন এইচ-১বি ভিসার আবেদনের ক্ষেত্রে এককালীন ১ লাখ ডলার ফি আরোপের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরে ফেডারেল আদালতের আদেশে তা অবরুদ্ধ হয়।

নতুন সিদ্ধান্তে ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের ওপর কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে স্থগিতাদেশের বাস্তব প্রয়োগ এবং পরবর্তী সরকারি পদক্ষেপের ওপর।