ফ্রান্সের শিক্ষা ব্যবস্থার চলমান সংকট এবার রূপ নিয়েছে রাজপথের তীব্র আন্দোলনে।
দেশটির সম্প্রচারমাধ্যম বিএফএমটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার (৫ অক্টোবর) এক দিনেই পুরো ফ্রান্স জুড়ে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০টি উচ্চবিদ্যালয়ে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ক্লাস বন্ধ থাকে। দেশটির শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রির দেয়া তথ্যানুসারে, এটি দেশটির মোট ৩ হাজার ৭০০টি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রায় ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। বিক্ষোভের কারণে ফ্রান্সের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
সংকটের সূচনা ও বিস্তার
সংকটের সূচনা হয় গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে। তবে বিগত এক সপ্তাহে এই অসন্তোষ দাবানলের মতো পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনে নেমেছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী।
শিক্ষার্থীদের মূল অভিযোগ
শিক্ষার্থীদের মূল অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দেশটির শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে না। ফলে অধিকাংশ স্কুল ভবন সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে এবং এসব ভবন রক্ষণাবেক্ষণে কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা লক্ষ করা যাচ্ছে।
এ ছাড়া পর্যাপ্ত শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় কর্মচারী না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন শিক্ষা কার্যক্রম। অনেক ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষার্থী নিয়ে শিক্ষা দান কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধ্য হচ্ছে শিক্ষকরা।
ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে পরিস্থিতি
কেবল প্যারিস সংলগ্ন ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলেই সোমবার (৫ অক্টোবর) ১৬০টিরও বেশি উচ্চবিদ্যালয় বন্ধ রাখার কথা ছিল। কিন্তু সকাল হতে না হতেই পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেয়।
রাজধানীর ভোকল্যাঁ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবেশপথে সকালে পর পর ৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে প্রথম আগুনের খবর পেয়েই পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেন প্রধান শিক্ষক। পরে নিরাপত্তার স্বার্থে ভবনের ভেতরে অবস্থানরত শিক্ষার্থী ও কর্মীদের আটকে রেখে উদ্ধার কাজ শুরু হয় এবং প্রায় ১০০ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়।
অন্যদিকে, প্যারিসের ঐতিহাসিক তুরগো উচ্চবিদ্যালয়ে ভোর থেকেই আবর্জনার বাক্স, লোহার বেড়া ও সাইনবোর্ড ফেলে প্রধান ফটক অবরুদ্ধ করে রাখে আন্দোলনকারীরা।
সহিংসতা ও গ্রেপ্তার
সহিংসতার ধরন ও মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তথ্য বলছে, আন্দোলন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় ৫ হাজার মানুষকে। উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৮৫ শতাংশই ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলের অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থী।
আন্দোলনে এ পর্যন্ত ২৪টি স্কুলে আগুন দেয়া ও মারাত্মক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সংঘাত সামলাতে গিয়ে মারাত্মক আহত হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৭৮ জন কর্মী এবং প্রায় ৬০০ জন পুলিশ ও জেন্ডারম সদস্য। অপরদিকে, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ১৭০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার ঘটনায় ইতোমধ্যে বিচারিক তদন্ত শুরু করেছে ফরাসি জাতীয় পুলিশের সাধারণ পরিদর্শক দপ্তর।
সরকারের পদক্ষেপ
দেশজুড়ে এ ধরনের অচলাবস্থা নিরসনে অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে অ্যালিসি প্যালেস। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং শিক্ষার্থীদের দাবি পর্যালোচনায় ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া বায়রু ইতোমধ্যে পাঁচটি বিশেষ প্রস্তাব দিয়েছেন।
সরকারের লক্ষ্য, আগামী অক্টোবরের শেষ নাগাদ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই শিক্ষাসংকট নিরসনে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। তবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ না ছাড়ার ঘোষণায় অনড় ফরাসি শিক্ষার্থীরা।
আরও পড়ুন:







