রাজনীতির ময়দানে যখন বিভাজন আর বিদ্বেষের সুর, ঠিক তখনই ভারতের রাজধানী দিল্লিতে লেখা হলো মানবপ্রেমের এক নজিরবিহীন ইতিহাস।
দিল্লিতে অসহায় মায়ের করুণ আকুতি
দিল্লির এইমস হাসপাতালের বাইরে তখন দুই বছর বয়সী সন্তানকে কোলে নিয়ে ডুকরে কাঁদছিলেন এক অসহায় হিন্দু মা। কারণ? শিশুটি আক্রান্ত 'এসএমএ টাইপ-ওয়ান' নামক এক অত্যন্ত বিরল ও প্রাণঘাতী জেনেটিক রোগে। জীবন রক্ষাকারী একটিমাত্র ইনজেকশনের দাম আকাশছোঁয়া ৯ কোটি ৭০ লাখ রুপি।
সেই অসহায় মায়ের করুণ আকুতি দেখে থমকে দাঁড়ায় কয়েকজন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও স্থানীয় তরুণ।
জামে মসজিদে সহায়তা বুথ
সাধ্যের অতীত সেই অর্থ জোগাতে তারা বার্তা পৌঁছে দেয় দিল্লির ঐতিহাসিক জামে মসজিদের মুসল্লি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে। জুমার নামাজ শেষে মসজিদের বাইরেই খোলা হয় সহায়তা বুথ; নগদ অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি দ্রুত চালু করা হয় ইউপিআই ও কিউআর কোডভিত্তিক অনলাইন পেমেন্ট। আর তাতেই ঘটে অলৌকিক ঘটনা। ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে মাত্র কয়েক দিনে সংগৃহীত হয় প্রায় ৬ কোটি ৩৩ লাখ রুপি।
সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবতার এমন দৃষ্টান্ত নেটদুনিয়ায় তোলপাড় ফেললে সরব হয় প্রভাবশালী কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। এক সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার চরম তাচ্ছিল্যের সুরে বিদ্বেষ ছড়ানোদের উদ্দেশে কটাক্ষ করে বক্তব্য দেন।
অন্যদিকে, আরেক ক্রিয়েটর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাহায্য করা প্রত্যেকেই টুপি পরা মুসলিম। যারা বলে ভারতে হিন্দুরা মুসলমানদের কাছে নিরাপদ নয়, এটি তাদের মুখে এক রাজকীয় চপেটাঘাত।
ছত্তিশগড়ে হিন্দুদের পাশে মুসলিমরা
অন্যদিকে, ভারতে হিন্দুদের পাশে দাঁড়ানোর এই নজির নতুন নয়। সম্প্রতি ভারতের সিজিপির আন্দোলন দমাতে একপর্যায়ে চরম আগ্রাসী হয়ে ওঠে পুলিশ প্রশাসন। বেধড়ক লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পুলিশের হামলা থেকে বাঁচতে আন্দোলনরত অসংখ্য তরুণ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে যায় তাদের মন্দিরে। কিন্তু মন্দিরের পুরোহিতরা আশ্রয় দেয়ার বদলে ভেতর থেকে আটকে দেয় প্রধান ফটক। দেবতার ঘরের দরজা মানুষের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার এই দৃশ্য স্তব্ধ করে দেয় আন্দোলনকারীদের। তবে, মন্দিরে আশ্রয় না পেলেও সেসময় ওই হিন্দু তরুণরা সহযোগিতা পেয়েছিলো স্থানীয় মুসলিমদের।
মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ
অথচ, এই অভূতপূর্ব মানবিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারতে মুসলিমদের প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতার চিত্র। মানবাধিকার সংগঠন ও অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে মুসলিমবিরোধী বৈষম্য, নিপীড়ন ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নির্যাতন রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে।
ভোটের রাজনীতির স্বার্থে প্রায়শই শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের মুখে শোনা গেছে উসকানিমূলক ভাষণ। নরেন্দ্র মোদি মুসলিমদের 'অনুপ্রবেশকারী' কিংবা 'বেশি সন্তান জন্মদানকারী' হিসেবে চিহ্নিত করে সাধারণ মানুষের মাঝে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এই ঘটনায়, যদিও মোদী পরে দাবি করেন, তাঁর বক্তব্য মুসলিমদের টার্গেট করে ছিল না।
বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের গণ্ডি পেরিয়ে সেই আঘাত এখন নেমে এসেছে বাস্তবেও। তথাকথিত 'বুলডোজার সংস্কৃতির' নামে আদালতের তোয়াক্কা না করেই গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে মুসলিমদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট এবং শতাব্দীর প্রাচীন ঐতিহাসিক ও স্থানীয় বহু মসজিদ। উচ্ছেদের নামে একের পর এক ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙার ঘটনা চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এখানেই শেষ নয়; গরুর মাংস খাওয়া, পরিবহন বা বিক্রির ভুয়া সন্দেহে চরমপন্থী গোষ্ঠীর হাতে অগণিত মুসলিমকে শিকার হতে হয়েছে নির্মম 'মব লিঞ্চিং' বা পিটিয়ে হত্যার মতো সহিংসতার। পাশাপাশি, অর্থনৈতিক বয়কট, ভুয়া মামলায় গ্রেপ্তার এবং বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের ভয় দেখিয়ে, ভারতে মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করার প্রক্রিয়া চলছে বলে অভিযোগ বিশ্লেষকদের।
অনেকেই প্রশ্ন তুলছে, ভারতের শীর্ষ নেতৃত্ব যখন বিদেশে গিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রের প্রধানদের বুকে জড়িয়ে ধরে, ঠিক তখনই নিজ দেশে বছরের পর বছর ধরে থাকা মসজিদগুলো ভেঙে ফেলা হয় এবং মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন চালানো হয়।
সরকার বা ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এসব বৈষম্য ও নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করলেও, দিল্লির জামে মসজিদের এই ভালোবাসার চিত্রটি প্রমাণ করে, রাজনীতি ও প্রশাসনিক নিপীড়ন যত গভীরই হোক না কেন, সাধারণ মুসলিমদের বুকে মানবতা ও ভালোবাসার স্থান এখনো অনেক উঁচুতে।
আরও পড়ুন:







