শনিবার

৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮ আশ্বিন, ১৪৩৩

হুথিদের বিরুদ্ধে বড় সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:১৪

শেয়ার

হুথিদের বিরুদ্ধে বড় সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব
ছবি সংগৃহীত

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপকূলীয় এলাকা মুক্ত করা অথবা একাধিক ফ্রন্টে একযোগে হামলা চালানোর দুটি কৌশল বিবেচনা করছে রিয়াদ।

সামরিক প্রস্তুতি সম্পর্কে অবগত ছয়জন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সম্ভাব্য এই অভিযান শুরু হতে পারে। সৌদি আরবের তত্ত্বাবধানে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী স্থলযুদ্ধে নেতৃত্ব দেবে এবং সৌদি বিমানবাহিনী তাদের সরাসরি বিমান হামলার মাধ্যমে সহায়তা করবে।

নিরাপত্তা ইস্যু সংবেদনশীল হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মকর্তারা জানান, ওয়াশিংটন রিয়াদকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ প্রধানত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিলেও সৌদির কোনো মিত্র রাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধাভিযানে অংশ নেবে না।

বাব এল-মান্দেব পুনর্দখলের দুটি কৌশল

পরিকল্পিত অভিযানের মূল লক্ষ্য গত মাসে হুথিদের আকস্মিক অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে বাব এল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা। বৈশ্বিক ও ইয়েমেনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ জন্য রিয়াদের সামনে দুটি সামরিক বিকল্প রয়েছে।

প্রথম বিকল্প হলো বাব এল-মান্দেব প্রণালি ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় সীমিত আক্রমণ চালানো। দ্বিতীয়টি হলো আরও বড় পরিসরে ইয়েমেনের আল-বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ গভর্নরেটে একযোগে বহুমুখী হামলা চালানো।

অভিযানের মাত্রা অনুযায়ী এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েন করা হতে পারে। তবে সৌদি ও ইয়েমেন সরকার, হুথি মুখপাত্র এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে পরিকল্পনাটি নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে হুথিদের হাত থেকে রক্ষা করতে আরব জোটের প্রধান হিসেবে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে যুক্ত হয়েছিল সৌদি আরব। ২০২২ সালে হওয়া অস্ত্রবিরতি মূলত চলতি বছর পর্যন্ত কার্যকর ছিল। তবে ইরান যুদ্ধের জেরে হুথিরা সৌদি আরবের পণ্যবাহী জাহাজ ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করলে পরিস্থিতি আবার সংঘাতের দিকে মোড় নেয়।

বাব এল-মান্দেব লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রবেশদ্বার এবং ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। চলতি বছরে ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ায় এই নৌপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

পশ্চিমা কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, হুথিরা বাব এল-মান্দেবের মতো বৈশ্বিক কৌশলগত পথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখলে কোনো শান্তি আলোচনায় না বসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে রিয়াদ। তবে অভিযান শুরুর সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনও নিশ্চিত নয়। এটি এক সপ্তাহের মধ্যে শুরু হতে পারে, আবার নভেম্বরের শুরুতে অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও গড়াতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তা, তুরস্ক-পাকিস্তানের সামরিক সরঞ্জাম

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি মনে করেন, এবারের অভিযান সংকীর্ণ পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে এবং ২০১৫ সালের সর্বাত্মক অভিযানের মতো বড় নাও হতে পারে। তার মতে, হুথিদের নির্মূল করার তীব্র ইচ্ছা থাকলেও আপাতত মূল অগ্রাধিকার হবে বাব এল-মান্দেব অঞ্চলের পূর্ববর্তী স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং স্বাভাবিক নৌচলাচল নিশ্চিত করা।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের পক্ষে সরাসরি বিমান হামলার মতো পদক্ষেপে জড়াতে অস্বীকৃতি জানালেও যুক্তরাষ্ট্র সৌদি বিমান হামলা পরিচালনায় সামরিক উপদেষ্টা এবং লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে।

গত মাসে সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করা তুরস্ক ও পাকিস্তান রিয়াদকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করছে।

সম্প্রতি পাকিস্তান চারটি কার্গো বিমানে করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন ও ড্রোন-বিধ্বংসী প্রযুক্তি ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কেন্দ্র এডেনে পাঠিয়েছে। ইয়েমেনি বাহিনীকে সহায়তা দিতে সৌদি বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারাও মাঠে কাজ করছেন। সৌদি আরবের কেনা তুর্কি ড্রোনও ইয়েমেনের আকাশে নজরদারিতে ব্যবহার করা হয়েছে।

সৌদি স্থাপনার নিরাপত্তায় পাকিস্তানি সেনা

অভিযান শুরু হলে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র থেকে নিজেদের তেলক্ষেত্র ও স্থাপনা রক্ষা করাই রিয়াদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। এ জন্য পাকিস্তান গত বছর থেকে সাম্প্রতিক উত্তেজনা পর্যন্ত সৌদি আরবে ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। এসব সেনা সৌদি স্থলসীমান্ত পাহারা দেওয়া এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার কাজে নিয়োজিত।

তবে ইয়েমেনের ভেতরে সরাসরি কোনো যুদ্ধক্ষম সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত পাকিস্তান নেয়নি বলে একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। এ ছাড়া সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় বন্দরনগরী ইয়ানবুর নিরাপত্তায় সেনা ও প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স।

ইয়েমেনি বাহিনীর বিভক্তি বড় চ্যালেঞ্জ

স্থলভাগে ইয়েমেনি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি রিয়াদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিভিন্ন উপদলের ওপর নির্ভর করেই স্থল অভিযান চালাতে হবে।

সামরিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশার মনে করেন, হুথিদের মতো সুসংগঠিত বাহিনীকে পিছু হটাতে সরকারপন্থীদের প্রয়োজনীয় সংহতি এখনও গড়ে ওঠেনি।

গত শীতে আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় বাহিনী পূর্বাঞ্চল দখলের চেষ্টা ও বিচ্ছিন্নতার ডাক দিলে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে তাদের রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়। এতে তাদের ঐক্যে বড় ফাটল তৈরি হয়।

সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবি বলেন, এখন পর্যন্ত অবস্থান ধরে রাখাই মূল অগ্রাধিকার ছিল। তবে এবার পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ শুরু হবে এবং পুরো অভিযানের সাফল্য স্থানীয় পদাতিক বাহিনীর সামরিক দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে।

লেবাননে হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়ার পর বর্তমানে হুথিরাই মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্রে পরিণত হয়েছে। ফলে নতুন এই অভিযান ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া আঞ্চলিক যুদ্ধকে আরও বিপজ্জনক ধাপে নিয়ে যেতে পারে।