লেবাননে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও অর্থনৈতিক সংকটে শিশুদের জীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দেশটির প্রতি পাঁচটি পরিবারের অন্তত একটিতে শিশুরা ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাতে ঘুমাতে যায়। একই অনুপাতে পরিবারগুলো নিরাপদ খাবার পানির তীব্র সংকটে রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ।
বুধবার ইউনিসেফ এ সতর্কবার্তা দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
মানসিক চাপে ৭ লাখ ৭০ হাজার শিশু ও তরুণ
ইউনিসেফ জানায়, দেশটিতে চলমান সংকটের কারণে অন্তত ৭ লাখ ৭০ হাজার শিশু ও তরুণ গভীর মানসিক চাপে ভুগছে। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি, পড়াশোনা ব্যাহত হওয়া, চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় তাদের ওপর এই চাপ তৈরি হয়েছে।
লেবাননে ইউনিসেফের প্রতিনিধি মার্কোলুইজি কোর্সি বলেন, দেশটির শিশু ও তরুণদের এমন একটি বোঝা বহন করতে হচ্ছে, যা কোনো শিশুরই বহন করা উচিত নয়। জরুরি ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই চাপ তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে বহু বছরের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর প্রতি তিনটির একটি জানিয়েছে, আর্থিক অনটনের কারণে তারা সন্তানদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারেনি। ১৪ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তাদের অন্তত একটি শিশু শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারির তুলনায় এই হার দ্বিগুণেরও বেশি।
আঞ্চলিক যুদ্ধের মধ্যে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর রক্তক্ষয়ী সংঘাত শিশুদের ওপর এই চাপ আরও বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ছয় মাসে নিহত ও আহত ১ হাজার ৩১৭ শিশু
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ২৬১ শিশু নিহত এবং ১ হাজার ৫৬ জন আহত হয়েছে। আহত শিশুদের প্রায় ১২ শতাংশ স্থায়ী প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বেঁচে রয়েছে।
সংঘাতের কারণে ৪৩৬টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এতে প্রায় ১ লাখ শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এসব হামলায় ৮৬ জন শিক্ষক নিহত বা আহত হয়েছেন।
শিক্ষার ব্যয় কমিয়েছে ৪৬ শতাংশ পরিবার
যেসব এলাকায় স্কুল খোলা রয়েছে, সেখানেও আর্থিক অনটন ও মানসিক আঘাতের কারণে শিশুদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। ৪৬ শতাংশ পরিবার শিক্ষার পেছনে ব্যয় কমিয়েছে এবং ১৭ শতাংশ পরিবার সন্তানদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়েছে।
স্কুলে ভর্তি থাকা শিশুদের ২৯ শতাংশ মানসিক কষ্ট ও মনোযোগের সমস্যার কারণে স্বাভাবিকভাবে শিখতে পারছে না। অর্ধেকের বেশি পরিবার জানিয়েছে, গত ছয় মাসে তাদের শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। ৬৩ শতাংশ শিশু সবসময় আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তায় ভুগছে।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, শুধু মানবিক সহায়তার মাধ্যমে লেবাননের সংকটের ব্যাপকতা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। মার্কোলুইজি কোর্সি বলেন, জরুরি ও স্থায়ী পদক্ষেপ না নেওয়া হলে একটি পুরো প্রজন্ম এই সংকটের ক্ষত নিয়ে বড় হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির পরও হামলা ও বাস্তুচ্যুতি
গত ১৭ এপ্রিল লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও লেবাননের ভূখণ্ডে বিমান হামলা ও বাড়িঘর ধ্বংসের অভিযান বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয় সমন্বয় দপ্তর ওসিএইচএ দক্ষিণ লেবাননজুড়ে অব্যাহত বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও সামরিক অভিযানের কথা নিশ্চিত করেছে।
চলতি বছরের শুরুতে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ এখনো নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরতে পারেনি।
আরও পড়ুন:







