কাশ্মীরের পেহেলগাম হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মূসাকে চিহ্নিত করে ভারতীয় বাহিনীর অভিযানে তার মৃত্যুর দাবি করা হয়েছিল। তবে পাকিস্তান সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে হাশিম মূসাকে সংবাদ সম্মেলনে হাজির করেছে। পাকিস্তানের দাবি, ভারতীয় গণমাধ্যমে নিহত হিসেবে প্রচারিত ব্যক্তি জীবিত ও সুস্থ আছেন।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন।
ভারতের অভিযানের দাবি নিয়ে পাকিস্তানের বক্তব্য
আহমেদ শরীফ চৌধুরী বলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরে অভিযানে হাশিম মূসাকে নিষ্ক্রিয় বা হত্যা করার দাবি করলেও মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মূসা জীবিত ও সুস্থ আছেন। এ সময় তিনি আসিফকে সংবাদ সম্মেলনে সবার সামনে হাজির করেন।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, গত বছরের ২২ এপ্রিল পাহালগামে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন এক ব্যক্তি ভারতের নিয়ন্ত্রণাধীন কাশ্মীরের কোরাগ এলাকায় এনকাউন্টারে নিহত হন।
আহমেদ শরীফ চৌধুরী ওই ঘটনাকে তথাকথিত সন্ত্রাসী ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেন, এটি ভারতীয় রাজনৈতিক ও সামরিক বাহিনীর সাজানো ফলস-ফ্ল্যাগ অভিযান।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিন্নার কোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, যৌথ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী, পুলিশ ও কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিআরপিএফ) সমন্বয়ে কোরাগ ও ইউসমার্গের সাধারণ এলাকায় অভিযান শুরু হয়েছে।
পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে চিন্নার কোরের আরেকটি পোস্টে দাবি করা হয়, অভিযানে লস্কর-ই-তৈয়বার এক সন্ত্রাসীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করে, নিহত ব্যক্তির পরিচয় মোহাম্মদ আসিফ হিসেবে নিশ্চিত হয়েছে এবং তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিসেস গ্রুপের (এসএসজি) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোও (পিআইবি) একই ধরনের দাবি করে। মন্ত্রণালয়ের দাবি ছিল, মুসা ওরফে আসিফ ফৌজিকে নিষ্ক্রিয় করা মে মাসে শুরু হওয়া দীর্ঘমেয়াদি অপারেশন শেরুওয়ালির চলমান অভিযানের অংশ।
এ প্রসঙ্গে আহমেদ শরীফ চৌধুরী ব্যঙ্গ করে বলেন, ছয় মাসের কঠোর পরিশ্রমের পর মুসা ওরফে আসিফ ফৌজিকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে, তাই এ জন্য অভিনন্দন ও করতালি দেওয়া উচিত।
কাশ্মীরের একাধিক হামলায় জড়িত থাকার ভারতীয় দাবি
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যম আসিফকে কাশ্মীরে একাধিক হামলার সঙ্গে যুক্ত বলেও দাবি করেছিল। এর মধ্যে রয়েছে ২০২২ সালের ২৩ আগস্ট হালান, একই বছরের ২৩ ডিসেম্বর ডিকেজি, ২০২৩ সালের মে মাসে কান্ডি, ২০২৪ সালের মে মাসে শাহ সিতার, একই বছরের জুনে শিব খোরি, অক্টোবরে গানগানগীর ও বুটা পাহাড়ি এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাসিরা এলাকার হামলা।
ভারতীয় সরকার আরও দাবি করেছিল, আসিফের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একই গোষ্ঠীর আরও তিন সদস্যকে অভিযানে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
আহমেদ শরীফ চৌধুরী বলেন, সংবাদ সম্মেলনের পর এসব প্রচারণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিজেদের প্রচারের বিষয়ে লজ্জা পাওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টগুলো মুছে ফেলা উচিত।
তিনি একটি সরকারি বিবৃতির বরাত দিয়ে আরও বলেন, ওই অভিযানে লস্কর-ই-তৈয়বার চারজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডার নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছিল।
সংবাদ সম্মেলনে আসিফের বক্তব্য
সংবাদ সম্মেলনে আহমেদ শরীফ চৌধুরী মোহাম্মদ আসিফকে মঞ্চে আসতে বলেন। তিনি জানান, আসিফ পাকিস্তানের আটক জেলার বাসিন্দা।
আসিফ বলেন, আগের দিন তার বন্ধুরা ফোন করে জানিয়েছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়েছে যে কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাকে হত্যা করেছে এবং তিনি শহীদ হয়েছেন। তবে তিনি জীবিত ও সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন বলে জানান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতীয় নম্বর থেকে তার কাছে একাধিক ফোন আসে। ফোনকারীরা তার ব্যক্তিগত তথ্য, পরিচয়, অবস্থান এবং ভারতীয় বাহিনীর অভিযানে তার নাম জড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইছিল।
পরে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম তার ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে তাকে কাশ্মীরের একটি অভিযানে নিহত বা শহীদ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এতে তিনি বিস্মিত হন, কারণ তখন তিনি নিজের বাড়িতেই ছিলেন।
আসিফ জানান, তিনি বিষয়টি তার ইউনিটকে জানান। ইউনিট থেকে তাকে ভারতীয় নম্বর থেকে আসা সব ফোন ব্লক করতে বলা হয় এবং জানানো হয়, আইএসপিআরের কর্মকর্তারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
সেনাবাহিনীতে আসিফের চাকরি ও অবসর
আসিফ জানান, তিনি ২০০০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ২০০৫ সালে তিনি স্পেশাল সার্ভিসেস গ্রুপ বা এসএসজিতে যোগ দিয়ে সেখানে ১৮ বছর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন তিনি।
এরপর তিন বছর একটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। গত তিন থেকে চার মাস ধরে তিনি রাওয়ালপিন্ডিতে পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে বসবাস করছেন।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যমের অভিযোগকে আসিফ মিথ্যা, লজ্জাজনক ও অসম্মানজনক বলে অভিহিত করেন। এসব দাবির নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, সৃষ্টিকর্তার কৃপায় তিনি জীবিত এবং সবার সামনে উপস্থিত আছেন।
তিনি আরও বলেন, তিনি তার দায়িত্ব সাহসের সঙ্গে পালন করেছেন এবং পাকিস্তান সামনাসামনি জবাব দেয়, আড়াল থেকে নয়।
আরও পড়ুন:







