বুধবার

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫ আশ্বিন, ১৪৩৩

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব কি ধীরে ধীরে কমছে?

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২০:০৬

শেয়ার

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব কি ধীরে ধীরে কমছে?
ছবি সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাত মাসের সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যখন আলোচনা চলছে, তখন হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও তেল পরিবহণ আবার বাড়ছে। ট্যাংকার ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটগুলোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে তেল ও পেট্রোলিয়াম পরিবহণ ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর আগের মাত্রার প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে।

হরমুজ প্রণালিতে সামরিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়া এবং তেল প্রবাহ বাড়ার এই পরিস্থিতি ইরানের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধে ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লেও হরমুজ প্রণালিকে অবরুদ্ধ বা বাধাগ্রস্ত করার কৌশলটি ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে তেহরানের অন্যতম বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার ছিল।

তবে প্রণালিতে স্বাভাবিকতা পুরোপুরি ফিরে এসেছে কিংবা অর্থনৈতিক চাপে পড়ে ইরান সহজে নতি স্বীকার করবে—এমনটি মনে করা ঠিক হবে না বলে বিশ্লেষকদের মত।

হরমুজ দিয়ে তেল প্রবাহ বাড়ছে

পণ্য বিশ্লেষণকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কপলারের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানিতে বড় ধরনের পুনরুদ্ধার দেখা গেছে। সেপ্টেম্বর মাসে অঞ্চলটি থেকে দৈনিক রপ্তানি এক কোটি ৬৩ লাখ ২৮ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা সংঘাত শুরুর পর সর্বোচ্চ।

এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক প্রায় ৯৭ লাখ ১৯ হাজার ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়েছে। এর বড় একটি অংশ রপ্তানি করেছে সৌদি আরব। তবে যুদ্ধের আগে দৈনিক এক কোটি ৯৫ লাখ ১৩ হাজার ব্যারেল তেল পরিবহণের তুলনায় বর্তমান প্রবাহ এখনো দিনে প্রায় ৩২ লাখ ব্যারেল কম।

লন্ডনভিত্তিক আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুজানা স্ট্রিটার বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল প্রবাহ বাড়া আশাব্যঞ্জক হলেও সংঘাতের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই চলাচলকে পুরোপুরি নিরাপদ বলা যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, ডিজেল ও গ্যাসোলিনের মতো পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ এখনো সীমিত। তেলবাহী ট্যাংকারের বিমা খরচও বেশি থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।

ইরানের দাবি, সামরিক সংঘাত এখনো চলছে

হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের অবস্থান দুর্বল হয়ে যাওয়ার সামরিক ও কৌশলগত মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরের মুখপাত্র হোসাইন মোহেব্বি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে এখনো সামরিক সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। তার দাবি, ইরান দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ও শত্রুভাবাপন্ন ছোট ছোট জাহাজে আঘাত হানছে এবং তাদের পারাপার রোধ করছে। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র এর জবাব দেওয়ার সাহস পাচ্ছে না।

একই দিন ইউনাইটেড কিংডম মেরিন ট্রেড অপারেশনস জানায়, মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) হরমুজ প্রণালিতে তিনটি জাহাজে অজ্ঞাত প্রক্ষেপক বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে একটি তেলবাহী ট্যাংকারও রয়েছে।

অর্থনৈতিক চাপে ইরান, চাপ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রেও

দীর্ঘ সাত মাসের যুদ্ধ ও মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক প্রান্তিকে জিডিপি ১০ দশমিক ১ শতাংশ এবং তেল ও গ্যাস খাত ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৬৯ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। খোলা বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্যও ২২ লাখ রিয়াল ছাড়িয়ে যায়। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ ইসমাইলি এই পরিস্থিতিকে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তবে অর্থনৈতিক চাপ শুধু ইরানের ওপরই সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব পড়েছে। দেশটিতে ডিজেলের লিটারপ্রতি দাম ৭ শতাংশের বেশি বেড়ে রেকর্ড করেছে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে চাপ তৈরি করেছে।

এ কারণে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ তিন বছর পর সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। সামনে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় জ্বালানির উচ্চ দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি এক জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা তাঁর সর্বনিম্ন পর্যায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা আটকে আছে

সামরিক ও অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেও কূটনৈতিক আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে মার্কিন প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে কাতার মধ্যস্থতা চালিয়ে যাচ্ছে। কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের প্রস্তাবিত সাত দিনের রোডম্যাপ নিয়ে মার্কিন প্রতিক্রিয়াও পেয়েছেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে কাছাকাছি এলেও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার পদক্ষেপের কোনটি আগে ও কোনটি পরে বাস্তবায়ন করা হবে, মূলত সেই বিষয়েই চুক্তি ঝুলে রয়েছে।

ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহণ বাড়লেও সেখানে সামরিক উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ হয়নি। একই সময়ে অর্থনৈতিক চাপ এবং কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নিরসনের পথ খোঁজা হচ্ছে।