বুধবার

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫ আশ্বিন, ১৪৩৩

দুই দশক পর ইরাক থেকে পুরোপুরি বিদায় নিল মার্কিন সেনারা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:৩৮

শেয়ার

দুই দশক পর ইরাক থেকে পুরোপুরি বিদায় নিল মার্কিন সেনারা
ছবি সংগৃহীত

দীর্ঘ দুই দশকের সামরিক উপস্থিতির পর ইরাক থেকে পুরোপুরি বিদায় নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ২০০৩ সালে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরুর পর দেশটিতে থাকা মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে। এ উপলক্ষে ইরাকজুড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। সরকার চার দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ইরাকে থাকা শেষ মার্কিন সেনারা দেশটি ছেড়ে যান। এর মধ্য দিয়ে ইরাকে নতুন দিনের সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে দেশটির সরকার। তবে সেনা প্রত্যাহারের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেক ইরাকি।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ঘিরে ইরাকিদের মধ্যে আনন্দ ও উদ্বেগ—দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, এ পরিস্থিতি প্রতিবেশী ইরানের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। ইরাকে ইরানপন্থি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। মার্কিন বাহিনীর অনুপস্থিতিতে এসব গোষ্ঠী আরও সক্রিয় ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে তেহরান সুবিধা পেতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ছিল বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর)। এর এক দিন আগেই প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে বলে ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরাকে এখন আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কোনো সেনা নেই। তাদের অনুপস্থিতিতে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সক্ষম ইরাকি বাহিনী।

২০২৪ সালে সেনা প্রত্যাহারের সমঝোতা

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা পুরোপুরি সরিয়ে নিতে ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়। সে সময় দেশটিতে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা ছিলেন। গত বছর তাদের বেশির ভাগকে সরিয়ে নেওয়া হয়। শুধু আধা স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি এলাকাগুলোতে কিছু সেনা অবস্থান করছিলেন। তবে তাদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানায়নি মার্কিন বাহিনী।

২০০৩ সালে ইরাকে সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সাদ্দামের ফাঁসি দেওয়া হয়। ২০০৭ সালে ইরাকে মার্কিন সেনার সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তাদের একটি অংশ ২০১১ সালে ইরাক ছাড়ে। পরে ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য ইরাকে আবারও সেনা পাঠানো হয়।

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে বাগদাদের জন্য নতুন একটি যুগের সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে দেশটির সরকার। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে ইরাকের জন্য নতুন দিনের সূচনা হলো। দেশটি বিদেশি সব ধরনের সামরিক উপস্থিতি থেকে মুক্ত হবে এবং পুরো ভূখণ্ডের ওপর জাতীয় সার্বভৌমত্ব পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হবে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ঐতিহাসিক জয় বলছে ইরানপন্থি গোষ্ঠী

ইরাকে সক্রিয় ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের কমান্ডার আবু মোজতাবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘটনাকে ঐতিহাসিক জয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়ের অবসান হবে। ইরাকে দখলদারদের ব্যর্থতা দেশটির মানুষ উদ্‌যাপন করবে।

তবে ফালুজা অঞ্চলের একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর নেতা আবদুল রহমান আল-জোবাইর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, এই মুহূর্তে নিরাপত্তার দায়িত্ব পুরোপুরি নিজেদের হাতে নেওয়ার জন্য ইরাক প্রস্তুত নয়। ইরাকের জনগণ পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চায়। তবে মার্কিন বাহিনী এভাবে চলে যাওয়ায় যে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, সেটিই সব ইরাকির জন্য বড় শঙ্কার কারণ বলে তিনি মনে করেন।

তেহরানের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা

ইরাকে ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের মতো তেহরান-সমর্থিত বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। চলমান ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হামলা চালাতে এসব গোষ্ঠী ভূমিকা রাখছে। চলতি মাসেই ইরাক থেকে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পাইপলাইনে হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া ইরান যুদ্ধের সময় নিহত ১৮ মার্কিন সেনার মধ্যে সাতজন ইরাকে ছিলেন।

ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেছেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইরাক থেকে চলে যাওয়ায় কৌশলগতভাবে ইরানের লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, এর ফলে ইরাক থেকে এমন একটি সামরিক উপস্থিতি সরে যাচ্ছে, যারা বহু বছর ধরে দেশটিতে তেহরানের প্রভাবের বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষা করে এসেছে।