ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো শাহী মসজিদের একটি অংশ অপসারণকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে মসজিদের ওই অংশ অপসারণের কাজ শুরু হলে স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের একাংশ প্রতিবাদে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। এ ঘটনায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মসজিদের অংশ অপসারণ ঘিরে উত্তেজনা
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাত থেকে মসজিদের সামনে বিপুলসংখ্যক মুসলিম বাসিন্দা অবস্থান নেন। সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য মসজিদের একটি অংশ অপসারণের উদ্যোগের প্রতিবাদে তারা সেখানে জড়ো হন।
সোমবার সকালে প্রশাসন ওই অংশ অপসারণের কাজ শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের দাবি, একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের লক্ষ্য করে পাথর ছোড়েন। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে।
সংঘর্ষের ঘটনায় সাতটি মামলা করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ও আকাশ থেকে ধারণ করা ভিডিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি মসজিদের চারপাশে ব্যারিকেড দিয়ে চলাচল সীমিত করা হয়েছে।
পুরো মসজিদ ভাঙা হচ্ছে না: প্রশাসন
উজ্জয়িনী প্রশাসনের দাবি, পুরো শাহী মসজিদ ভাঙা হচ্ছে না। সড়ক প্রশস্তকরণের নির্ধারিত অংশের মধ্যে পড়া মসজিদের একটি ছোট অংশ অপসারণ করা হচ্ছে।
উজ্জয়িনীর জেলা প্রশাসক রোশন সিং জানিয়েছেন, মসজিদ কমিটির সম্মতিতেই ওই অংশ সরানো হচ্ছে। পুলিশের ভাষ্য, প্রকল্পের আওতায় পড়া অংশটি মোট মসজিদ চত্বরের ১০ শতাংশেরও কম।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, মসজিদ কমিটি প্রথমে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর ওই অংশ সরাতে সম্মত হয়েছিল। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরো মসজিদ ভেঙে ফেলার দাবি ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা বাড়ে।
২০২৮ সালের সিংহস্থ সামনে রেখে সড়ক প্রশস্তকরণ
মসজিদের অংশ অপসারণের কাজটি উজ্জয়িনীর বড় একটি সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের অংশ। ২০২৮ সালের সিংহস্থ ধর্মীয় সমাবেশকে সামনে রেখে শহরের সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। প্রকল্পের আওতায় সংশ্লিষ্ট সড়কটি ১৫ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রশাসনের দাবি, সিংহস্থ উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষ উজ্জয়িনীতে আসবেন। তাদের চলাচল, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সড়ক প্রশস্ত করা প্রয়োজন।
মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টও মসজিদের অংশ অপসারণের বিরুদ্ধে করা আবেদন খারিজ করার সময় জননিরাপত্তা ও যাতায়াত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে।
ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষার দাবি মুসলিম প্রতিনিধিদের
মুসলিম প্রতিনিধিদের দাবি, শাহী মসজিদটি প্রায় ছয় শতাব্দী বা ৬০০ বছরের পুরোনো এবং এটি ওয়াকফ সম্পত্তি। যে অংশটি সরানোর কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে নামাজের কক্ষের একটি অংশ, প্রায় ১২০ ফুট উঁচু মিনার এবং মাজহার চৌক এলাকার অংশ রয়েছে।
মসজিদ কমিটি ও স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের বক্তব্য, মসজিদ অক্ষত রেখেও রাস্তার বিপরীত পাশের জমি নিয়ে সড়ক প্রশস্ত করা সম্ভব। তাদের প্রশ্ন, বিকল্প ব্যবস্থা না নিয়ে ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনার অংশ কেন সরাতে হবে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি মোহাম্মদ জাকির বলেন, তারা মসজিদটি রক্ষার চেষ্টা করছেন। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে রাতভর মসজিদ এলাকায় অবস্থান করেন।
ইমাম মোহাম্মদ ইব্রাহিমও ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষার দাবি জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, এর আগে সড়ক প্রশস্ত করার কাজে সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে আশপাশের দোকান ও অন্যান্য সম্পত্তি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
মসজিদের অংশ অপসারণের বিরোধিতা গড়ায় আদালতে
শাহী মসজিদের অংশ অপসারণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চে আবেদন করে মসজিদ কমিটি। ৯ সেপ্টেম্বর আদালত ওই আবেদনগুলো খারিজ করে দেয়।
আদালত বলেছে, উজ্জয়িনী পৌর কর্তৃপক্ষ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, একই সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের আওতায় এরই মধ্যে ১০টি মন্দির ও একটি মসজিদের অংশ অপসারণ করা হয়েছে। উজ্জয়িনীতে প্রায় ৮০টি ধর্মীয় স্থাপনা-সংক্রান্ত নির্মাণের বিরুদ্ধেও কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিয়েছে বলে আদালত উল্লেখ করেছে।
আদালত আরও বলেছে, শুধু ধর্মীয় স্থাপনা হওয়ার কারণে কোনো স্থাপনা আইনসম্মত উন্নয়ন প্রকল্পের আওতার বাইরে থাকবে, এমন নয়।
ধর্মীয় স্থাপনা অপসারণ নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে বিতর্ক
উজ্জয়িনীর ঘটনা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ধর্মীয় স্থাপনা ও মুসলিমদের সম্পত্তি অপসারণ নিয়ে চলমান বিতর্ককে সামনে এনেছে। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, আসাম, দিল্লি, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশে ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও বিক্ষোভের পর ১২৮টি সম্পত্তি ভাঙার তথ্য তারা নথিবদ্ধ করেছে। এসবের মধ্যে মুসলিমদের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থান ছিল। সংস্থাটির হিসাবে, এসব ঘটনায় অন্তত ৬১৭ জন ক্ষতিগ্রস্ত হন।
অ্যামনেস্টি এসব ভাঙাকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও শাস্তিমূলক উচ্ছেদ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে এটি সংস্থাটির নিজস্ব গবেষণা ও মূল্যায়ন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের স্বীকৃত সরকারি পরিসংখ্যান নয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৫ সালের ভারতবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের কয়েকটি রাজ্যে মুসলিমদের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া ভেঙে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাড়িঘর ভাঙার আগে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের নির্দেশনা দেয়।
সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পেও মসজিদ-মাজার অপসারণ
সড়ক প্রশস্তকরণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ধর্মীয় স্থাপনা অপসারণের আরও কয়েকটি ঘটনা বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ সরকারি জমি, রাস্তার নির্ধারিত সীমানা বা কথিত অবৈধ নির্মাণ অপসারণকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
২০২৬ সালের জুনে গুজরাটের আহমেদাবাদে সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের আওতায় তিনটি মাজার ও একটি কবরস্থানের অংশ অপসারণের খবর প্রকাশিত হয়। প্রশাসনের বক্তব্য ছিল, স্থাপনাগুলো সরকারি জমিতে ছিল এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের মে মাসে ফরিদাবাদে সড়ক ও দ্রুতগতির রেলপথ প্রকল্পের জন্য একটি মসজিদ ও একটি মন্দিরসহ ধর্মীয় স্থাপনা অপসারণের ঘটনাও সামনে আসে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ আগাম নোটিশ না পাওয়ার অভিযোগ করেন। কর্তৃপক্ষ স্থাপনাগুলোকে কথিত অবৈধ নির্মাণ হিসেবে উল্লেখ করে।
বারাণসীতেও সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের আওতায় একটি মসজিদের অংশ স্বেচ্ছায় ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হয়। একই প্রকল্পে এর আগে আরও পাঁচটি মসজিদ পুরোপুরি বা আংশিকভাবে অপসারণ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উজ্জয়িনীতে নিরাপত্তা জোরদার
শাহী মসজিদের অংশ অপসারণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পর উজ্জয়িনীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। মসজিদের চারপাশে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, সংঘর্ষে জড়িতদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ও আকাশ থেকে ধারণ করা ভিডিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা উসকানিমূলক তথ্য ছড়ানোর বিষয়ও তদন্ত করা হচ্ছে।
পুলিশের দাবি, পুরো শাহী মসজিদ ভেঙে ফেলার কথা বলে কৃত্রিমভাবে তৈরি কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তেজনা বেড়ে যায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের আওতায় মসজিদের একটি অংশই অপসারণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে মসজিদ কমিটি ও স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের দাবি, ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনাটির ওই অংশ সংরক্ষণ করা উচিত।
আরও পড়ুন:







