উন্নত জীবনের খোঁজে সৌদি আরবে গিয়ে এক নতুন আতঙ্কের মুখোমুখি বাংলাদেশী প্রবাসীরা। রিয়াদ, বাথা, হারা এবং মানফুয়ার মতো এলাকাগুলোতে এখন রীতিমতো আতঙ্ক ছড়াচ্ছে অপহরণ চক্র। ফুড ডেলিভারি, নির্মাণ শ্রমিক কিংবা ক্লিনিংয়ের কাজ করতে বের হওয়া প্রবাসীদের টার্গেট করছে চক্রটি। উবার বা সাধারণ গাড়িতে করে তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দুর্গম মরুভূমিতে।
অপহরণের শিকার হয়ে নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার
অপহরণের শিকার হয়ে নিঃস্ব হচ্ছে বহু পরিবার। জানা গেছে, লক্ষ্মীপুরের নূরে আলম সবুজ নামের একজনকে অপহরণ করে, আদায় করা হয়েছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ। বাথা মার্কেট এলাকা থেকে বাবুল নামের আরো একজনকে তুলে নিয়ে দাবি করা হয় ২৪ লাখ টাকা। পরে, সাড়ে ১৩ লাখ টাকা দেয়ার পরও, আরো টাকা জন্য চাপ দেয়া হয়, বাবুলের বাড়িতে।
এছাড়াও জানা গেছে, মানফুয়া এলাকা থেকে দুর্বৃত্তরা আরিফ হোসেনকে তার ব্যবহৃত গাড়িসহ অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যদের কাছে তার মুক্তির বিনিময়ে, ১৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
অন্যদিকে, গত এপ্রিলে হারা নামক এলাকায় আব্বাস উদ্দিন নামের এক ব্যক্তির ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার ওপর এই হামলা চালায়। এ সময় বাবাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তার ছেলে, এসএসসি পরীক্ষার্থী শাহরিয়ারও দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়ে আহত হন। অভিযোগ রয়েছে, চরম এই বিপদের মুহূর্তেও বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছ থেকে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সহায়তা।
ফ্রি ভিসার দৌরাত্ম্যে প্রবাসীদের দুর্ভোগ
শুধু অপহরণই নয়, প্রবাসীদের রক্ত চুষে খাচ্ছে ফ্রি ভিসা নামে গড়ে ওঠা প্রতারক চক্র। ফ্রি ভিসা নামক প্রতারণামূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে শ্রমিকদের বিদেশে নেয়া হচ্ছে, যা বিশ্বের অন্য কোনো দেশে সাধারণত দেখা যায় না। জানা যায়, এই ভিসায় বিদেশে গিয়ে অসংখ্য প্রবাসী কাজ না পেয়ে বেকার বসে আছেন এবং নানাবিধ বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন।
এছাড়া, ভারত বা নেপালের শ্রমিকরা যেখানে মাত্র এক লাখ বা তার চেয়েও কম খরচে সৌদি আরব যাচ্ছেন, সেখানে বাংলাদেশিদের গুনতে হচ্ছে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা। যাওয়ার আগে, মাসে পনেরোশো থেকে দুই হাজার রিয়াল বেতনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও, সেখানে গিয়ে জুটছে মাত্র ৪০০ রিয়াল। যা আধুনিক দাসত্বেরই নামান্তর। পিছিয়ে নেই নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার চিত্রও।
পাসপোর্ট ও এনআইডি জটিলতায় চরম ভোগান্তি
মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে পাসপোর্ট ও এনআইডি জটিলতা। নামের বানানে মিয়া বা মোহাম্মদের মতো সামান্য ভুলের কারণে মাসের পর মাস আটকে থাকছে পাসপোর্ট নবায়ন। বাতিল হচ্ছে আকামা ও ওয়ার্ক পারমিট। দালালদের টাকা দিলে কাজ হলেও, সাধারণ প্রবাসীদের দিনের পর দিন দূতাবাসের বাইরে অসহনীয় গরমে দাঁড়িয়ে পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি।
প্রবাসী সংখ্যা বৃদ্ধি ও ফেরত আসা শ্রমিক
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সালে সৌদি আরবে যাওয়া ৪ লাখ প্রবাসীর সংখ্যা ২০২৫-এ দাঁড়ায় প্রায় ৭ লক্ষে। অথচ, বৈধ কাগজ ও আকামার অভাবে ২০২৩ সালে ৫৯ হাজার এবং ২০২৪ সালে ৫০ হাজার শ্রমিক আউটপাসের মাধ্যমে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। বিপুল সংখ্যক এই ফেরত আসা শ্রমিকের পুনর্বাসনেও নেই কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি পদক্ষেপ।
প্রবাসীদের দুর্ভোগ কেবল বিদেশের মাটিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এয়ারপোর্টেও তাদের চরম হয়রানি ও দুরবস্থার শিকার হতে হয় অনেক আগে থেকেই।
রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এই মানবেতর পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে, জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি সংশ্লিষ্টদের। প্রতারক রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর লাইসেন্স বাতিলের পাশাপাশি, অপহরণকারীদের ধরতে সৌদি পুলিশের সাথে সমন্বয় করে ক্রাইসিস রেসপন্স টিম গঠন এখন সময়ের দাবি। একইসাথে, মুক্তিপণের অবৈধ লেনদেন বন্ধে তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগীরা।
আরও পড়ুন:







