সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে ইসরায়েলি বিমান হামলা থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাওয়ার সাত মাস পর ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক আব্বাস আরাগচি নিউইয়র্কে কূটনৈতিক তৎপরতায় অংশ নিয়েছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই সফরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অচল কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরুর উদ্যোগও দেখা গেছে।
নিউইয়র্কে অবস্থানকালে আরাগচি দুই ডজনের বেশি কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাঁদের মধ্যে ইউরোপের ১০টির বেশি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিনিধিও ছিলেন। জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদির সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে জর্ডানের ভূখণ্ডে ইরান হামলা চালিয়েছিল।
উইটকফের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক
আরাগচির সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠকগুলোর একটি ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে তাঁর সরাসরি বৈঠক। সংশ্লিষ্টদের মতে, তিন মাস ধরে অচল থাকা কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় চালুর লক্ষ্যেই এ বৈঠক হয়।
পরে আরাগচি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল করলে তেহরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে এগিয়ে আসবে। এর মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত সমঝোতার পথে আলোচনা শুরু হতে পারে বলেও জানান তিনি।
জাতিসংঘে পেজেশকিয়ানের বার্তা
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই মাথা নত করবে না। তাঁর এই বক্তব্য দেশের কট্টরপন্থীদের মধ্যে সমাদৃত হয়েছে। তবে তাঁদের কেউ কেউ এই সফরের বিরোধিতাও করেছিলেন। যুদ্ধকালীন নিষেধাজ্ঞা ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের একটি হোটেলে পেজেশকিয়ান পশ্চিমা সাংবাদিক ও থিংক-ট্যাংক বিশ্লেষকদের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁর সরকারের চিন্তাধারা তুলে ধরেন।
২৮ ফেব্রুয়ারির সকালের পরিস্থিতির সঙ্গে এই দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার মধ্যে দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকায় পেজেশকিয়ানের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছিল।
কট্টরপন্থীদের সমালোচনার মুখে আরাগচি
ইরানের কট্টরপন্থীরা শুরুতে ওয়াশিংটনের প্রতি পেজেশকিয়ান ও আরাগচির কূটনৈতিক উদ্যোগের সমালোচনা করেছিলেন। যারা ইরানের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ চালাচ্ছে, সেই দেশে সফরের সিদ্ধান্তকে তাঁরা আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখেছিলেন।
বিশেষ করে উইটকফের সঙ্গে বৈঠকের কারণে আরাগচি ইরানের রক্ষণশীল আইনপ্রণেতাদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম রেজাই গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কোনোভাবেই হঠকারিতার বিষয় নয়। কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে শত্রুপক্ষের প্রতিনিধির সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে, তার ব্যাখ্যা আরাগচিকে দিতে হবে বলেও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
কূটনৈতিক পথ ফের খোলার উদ্যোগ
রাজনৈতিকভাবে ভুল পদক্ষেপের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ইরানি কর্মকর্তারা এমন একটি সফরের আয়োজন করেন, যার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার পথ পুনরায় উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিশ্ববাসীর কাছে ইরানের টিকে থাকার বার্তা পৌঁছানো এবং আমেরিকান জনগণের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়।
পেজেশকিয়ান জাতিসংঘের মঞ্চে ইরানের দাবিগুলো তুলে ধরেন এবং বিভিন্ন দেশের সমকক্ষ নেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন।
এর বিপরীত চিত্র দেখা যায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রে। তিনি জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার সময় নিউইয়র্কের রাস্তায় তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। একই সময়ে জাতিসংঘের অধিবেশনে উপস্থিত বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা প্রতিবাদ জানিয়ে সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
যুদ্ধের মধ্যে ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতা
অতীতের দশকগুলোতেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইরানের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। তবে যুদ্ধের মধ্যে এবারের সফরটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় মহলের মনোযোগ বিবেচনায় নিয়ে তেহরানের কর্মকর্তারা কৌশলী পরিকল্পনার মাধ্যমে সফরটি আয়োজন করেছিলেন।
সূত্র: সিএনএন
আরও পড়ুন:







