শুক্রবার

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০ আশ্বিন, ১৪৩৩

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে কেন মোদি নেই

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:১৯

শেয়ার

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে কেন মোদি নেই
ছবি সংগৃহীত

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অংশ নিচ্ছেন না। তাঁর পরিবর্তে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। নিউইয়র্কে চলমান সাধারণ পরিষদের বিতর্কে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর ভারতের হয়ে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জয়শঙ্কর ভারতের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকেও অংশ নিচ্ছেন।

মোদি কেন এবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যাচ্ছেন না, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি কারণ প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।

সাম্প্রতিক দুই বছরেও জয়শঙ্করের নেতৃত্বে ভারত

মোদি ২০২৪ সালের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিয়েছিলেন এবং নিউইয়র্কে বিভিন্ন নেতার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। তবে ২০২৫ সালে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন জয়শঙ্কর। ২০২৬ সালেও একই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক দুই বছর ভারত প্রধানমন্ত্রীকে না পাঠিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে সাধারণ পরিষদের মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করানোর পথ বেছে নিয়েছে।

সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বিশ্বের প্রায় সব দেশ তাদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে। তবে বড় সিদ্ধান্ত বা সমঝোতা অনেক সময় সাধারণ অধিবেশনের বক্তৃতার বাইরে দ্বিপক্ষীয় ও ছোট আকারের বহুপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে এগোয়। ভারত বিভিন্ন মঞ্চ ও ফোরামেও তাদের অবস্থান তুলে ধরে আসছে।

নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারে ভারতের দীর্ঘদিনের দাবি

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার ভারতের দীর্ঘদিনের একটি দাবি। সাধারণ পরিষদের সম্মেলন শুরুর আগেই জাতিসংঘের সংস্কার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছে নয়াদিল্লি। বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায়ের চেষ্টাও চালাচ্ছে ভারত।

সর্বশেষ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ার দাবিতে ভারত ইউরোপের ভি-৪ বা ভিসেগ্রাদ গ্রুপের চার দেশ চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও স্লোভাকিয়ার সমর্থন আদায় করেছে। তবে জাতিসংঘ খুব শিগগির কাঠামোগত পরিবর্তন করবে, এমন আশা ভারতের নেই। ফলে শুধু সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার চেয়ে নির্দিষ্ট ফল পাওয়ার মতো কূটনৈতিক যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

ছোট বহুপক্ষীয় জোটে বাড়ছে গুরুত্ব

এই জায়গায় কোয়াড, ব্রিকস, জি-২০ এবং অন্যান্য ছোট বহুপক্ষীয় কাঠামোর গুরুত্ব রয়েছে। এসব ফোরামে তুলনামূলক কম দেশের সঙ্গে নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে সরাসরি আলোচনা করা যায়। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও বাণিজ্যের মতো বিষয়ে বাস্তব সমঝোতার সুযোগ থাকে।

ফলে মোদি নিউইয়র্ক সফরে না থাকলেও ভারতের কূটনৈতিক কার্যক্রম থেমে যাচ্ছে না। ২০২৬ সালের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে জয়শঙ্করের কর্মসূচিও বিষয়টি স্পষ্ট করে। তিনি শুধু সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার জন্য যাচ্ছেন না, বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকেও অংশ নিচ্ছেন।

ভারতের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারে জয়শঙ্করের ভূমিকা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের সাধারণ বিতর্কে আস্থার সংকট, পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা এবং জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার প্রশ্ন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

এ অবস্থায় জয়শঙ্করের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বড় কয়েকটি লক্ষ্য হলো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব, বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান এবং ২০২৮-২৯ মেয়াদে নিরাপত্তা পরিষদের আসনের জন্য ভারতের প্রচার। এসব বিষয়ে জয়শঙ্কার নিয়মিত ভারতের অবস্থান তুলে ধরছেন। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উপস্থিতি ছাড়াও ভারতের কূটনৈতিক বার্তা পৌঁছানো সম্ভব।

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও আলোচনায়

মোদির অনুপস্থিতির আলোচনায় ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথাও উঠে এসেছে। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সফল আন্দোলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই আন্দোলন মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিরোধী দলের ভোট চুরির অভিযোগের মধ্যে ভারতের নির্বাচন কমিশনের দুই কমিশনারের সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরোধ নিয়ে প্রকাশিত খবরও আলোচনায় এসেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার বাকি দুই কমিশনারকে কোনো গুরুত্ব দেন না। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি-আরএসএসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, ভোট চুরি ভারতীয় জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধ এবং সংবিধানের ওপর সরাসরি আক্রমণ। তিনি আরও বলেন, যারা এটি সংগঠিত করেছে তাদের রাষ্ট্রদ্রোহের কাজের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।

রাহুল গান্ধী ১৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিওও শেয়ার করেন। সেখানে তিনি নির্বাচন কমিশন ও এর কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, তাদের সময় আসবে এবং তারা পার পাবেন না।

এ ছাড়া ভারতে বেকারত্ব, চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস ও জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ইস্যুতেও মোদির সরকার চাপের মধ্যে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ভারতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির বিষয়ও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন

জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে মোদির যুক্তরাষ্ট্রে না যাওয়ার পেছনে দিল্লি-ওয়াশিংটন সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনও আলোচনায় এসেছে। রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কেনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং বাণিজ্যিক টানাপোড়েন বর্তমানে ভারতের কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সেপ্টেম্বরে রুশ জ্বালানি কেনা দেশগুলোর ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন আইনি পদক্ষেপ সামনে এসেছে। ভারত এ ক্ষেত্রে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈচিত্র্যময় উৎস থেকে আমদানির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।

মোদিকে ব্যক্তিগতভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় গুরুত্ব দিতেন। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেও ভারতের আলাদা গুরুত্ব ছিল। তবে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে আসার পর ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের ওপর ট্রাম্প একাধিকবার শুল্ক আরোপ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে শর্তসাপেক্ষে আরও ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের আদেশেও তিনি সই করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোদি-ট্রাম্প বৈঠকের পর বদলেছে সমীকরণ

মোদি ও ট্রাম্পের সর্বশেষ বড় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছিল ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর দুই নেতা আর একে অপরকে নিজ দেশে আতিথ্য দেননি। এ সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আগের তুলনায় এগিয়ে নিয়েছেন এবং পাকিস্তানি নেতাদের একাধিকবার হোয়াইট হাউসে আতিথ্য দিয়েছেন।

চলতি বছরের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প কৃতিত্ব দাবি করলে ভারত এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নেয়। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আগের মতো ভালো নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সফরে সময় ব্যবস্থাপনাও বিবেচনায়

ভারতের কূটনৈতিক ক্যালেন্ডার বর্তমানে একাধিক শীর্ষ সম্মেলন, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ ও বহুপক্ষীয় উদ্যোগে পূর্ণ। ফলে প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফোরামে ব্যক্তিগতভাবে পাঠানোর পরিবর্তে যেখানে তাঁর উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে বেশি প্রয়োজন, সেখানে সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কের মতো নিয়মিত বার্ষিক অনুষ্ঠানে একজন অভিজ্ঞ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠানো সেই সময় ব্যবস্থাপনার অংশ হতে পারে।

ফলে ২০২৬ সালের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মোদির অনুপস্থিতির পেছনে একক কোনো কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। সরকারি ব্যাখ্যাও প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন বিশ্লেষণে ভারতের বর্তমান কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারে অগ্রগতির অভাব, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে ভারতের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো সামনে এসেছে।