বৃহস্পতিবার

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৯ আশ্বিন, ১৪৩৩

ছয় মাসে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের প্রাণ কাড়তে পারে সুপার এল নিনো

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৫৭

শেয়ার

ছয় মাসে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের প্রাণ কাড়তে পারে সুপার এল নিনো
ছবি সংগৃহীত

চলতি বছরের শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড দাবদাহ, তীব্র খরা, দাবানল ও পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে আগামী ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ আশঙ্কা জানানো হয়েছে।

এল নিনোতে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৫১ হাজার মৃত্যুর আশঙ্কা

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্যান্য স্বাভাবিক বছরের তুলনায় চলতি বছরের জুন থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত এল নিনোর প্রভাবে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের তাপমাত্রাজনিত মৃত্যু হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে দরিদ্র দেশগুলোতে। এসব দেশ এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে খাদ্যসংকট এবং জ্বালানির অতিরিক্ত মূল্যের সঙ্গে লড়াই করছে।

গবেষণার সহলেখক ও ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ফেব্রুয়ারি নাগাদ এল নিনোর প্রভাব শেষ হওয়ার কথা থাকলেও গরমের ঝুঁকি ফেব্রুয়ারির পরও থাকতে পারে। আবহাওয়ার এই চরম পরিবর্তনের প্রভাব আগামী বছরের গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে।

তিনি বলেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বিশেষ করে সেসব স্থানে বেশি বিপজ্জনক, যেগুলো আগে থেকেই তুলনামূলক উষ্ণ ও দরিদ্র। কোনো তপ্ত অঞ্চলে তাপমাত্রা আরও কয়েক ডিগ্রি বাড়লে তা জীবনের জন্য অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

গ্রিনস্টোনের মতে, ধনী দেশগুলোতে সাধারণত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি), নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহ ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বেশি থাকে।

সাহেল অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির আশঙ্কা

গবেষণায় বিশ্বজুড়ে ২৪ হাজারের বেশি অঞ্চলের স্থানীয় তাপমাত্রার প্রাক্কলন এবং তা মানুষের মৃত্যুর ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেই তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকরা গত তিন দশকের গড় তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুর হারের সঙ্গে ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত এল নিনো সময়ের সম্ভাব্য মৃত্যুর হার তুলনা করে অতিরিক্ত প্রাণহানির হিসাব করেছেন।

গ্রিনস্টোন ও তার সহকর্মীদের গবেষণায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত গরমের সবচেয়ে বড় ধকল যাবে গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তের শুষ্ক সাহেল অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেখানে এল নিনোর কারণে সৃষ্ট গরমে অতিরিক্ত প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলকেও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া মিলিয়ে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ জন, ইন্দোনেশিয়ায় ১৯ হাজার ৩০০, ভারতে ১৫ হাজার ৮০০ এবং ব্রাজিলে ১৩ হাজার ৩০০ জনের অতিরিক্ত মৃত্যু হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

দাবদাহ মোকাবিলায় যেসব পদক্ষেপের সুপারিশ

এত বড় প্রাণহানির আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে গবেষণা প্রতিবেদনটি। এর মধ্যে রয়েছে দাবদাহের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, শীতলীকরণ কেন্দ্র, বিনা মূল্যে খাবার পানির বুথ স্থাপন, উন্মুক্ত স্থানে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা, হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বয়স্ক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা মানুষকে বাড়তি নজরদারির আওতায় আনা।

তাপমাত্রা চরম আকার ধারণ করার আগেই সরকারগুলো যেন জরুরি অর্থ ছাড় ও প্রয়োজনীয় সম্পদ প্রস্তুত রাখতে পারে, সে জন্য ‘পূর্বাভাসভিত্তিক অর্থায়নের’ আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকরা।

ভারতভিত্তিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অভিযন্ত তিওয়ারি বলেন, প্রতিবেদনটি আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য নয়, বরং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ হিসেবে দেখা উচিত। ভারতের মতো দেশগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা এক বিষয়, আর তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা আলাদা চ্যালেঞ্জ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ভবিষ্যতের জলবায়ুর ‘আগাম বার্তা’ এল নিনো

এল নিনো মূলত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। তবে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতিমধ্যে উত্তপ্ত হয়ে থাকা পৃথিবীতে চলতি বছরের অস্বাভাবিক শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হয়ে চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, এল নিনোর সময়ে বিশ্বের স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিক বছরের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এতে স্বাভাবিক বছরের তুলনায় ৪৪ শতাংশ বেশি চরম দাবদাহের দিন তৈরি হতে পারে।

সংস্থাটি বলেছে, চলতি বছরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির চিত্র থেকে ধারণা পাওয়া যায়, আজ থেকে প্রায় ২০ বছর পর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর স্বাভাবিক আবহাওয়া কেমন হতে পারে। গবেষকদের মতে, পৃথিবী আরও উত্তপ্ত হওয়ার সঙ্গে ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে, বর্তমান এল নিনো তার একটি আগাম বার্তা দিচ্ছে।

গবেষকেরা মনে করেন, এর মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের জন্য কোন কোন এলাকায় জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব, তা চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সূত্র: এপি, দ্য গার্ডিয়ান