রবিবার

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৫ আশ্বিন, ১৪৩৩

নিজের ফাঁদেই আটকা ভারত: বাংলাদেশকে পাকিস্তান না ভাবার সতর্কবার্তা শেখর গুপ্তের

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯:০২

শেয়ার

নিজের ফাঁদেই আটকা ভারত: বাংলাদেশকে পাকিস্তান না ভাবার সতর্কবার্তা শেখর গুপ্তের
ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সঙ্গে এক করে দেখার প্রবণতা ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ভারতীয় সাংবাদিক ও দ্য প্রিন্টের প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্ত। তাঁর মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রয়োজনের কারণে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে একই দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এতে শেষ পর্যন্ত নয়াদিল্লির কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত তাঁর সাপ্তাহিক ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট কলামে শেখর গুপ্ত বলেন, ভারত নিজের তৈরি একটি ফাঁদে আটকে পড়েছে।

বাংলাদেশ-পাকিস্তানকে একই দৃষ্টিতে দেখার ঝুঁকি

শেখর গুপ্তের মতে, শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের প্রভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আরও জটিল হয়েছে।

তবে দুই দেশকে একই কাতারে রেখে দেখার প্রবণতা ভারতের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রয়োজন এবং ঘন ঘন নির্বাচনী প্রচারের কারণে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সঙ্গে একই বন্ধনীতে আনা হয়েছে।

বিশেষ করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ইস্যুর ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য এই প্রবণতাকে আরও জোরালো করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের বক্তব্যেও বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে জানান শেখর গুপ্ত। তাঁর মতে, ছোট প্রতিবেশী ধরনের মনোভাবের সঙ্গে এসব বক্তব্য যুক্ত হওয়ায় ঢাকার মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে পূর্বশর্ত না করার পরামর্শ

শেখর গুপ্ত মনে করেন, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর ভারতে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তার কারণে তাঁর আবার ক্ষমতায় ফেরাকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা উচিত নয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন ঘটানো ভারতের এজেন্ডায় নেই এবং নরেন্দ্র মোদি সরকারও বিষয়টি বোঝে। ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার জন্য নয়াদিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতাতেও এর ইঙ্গিত রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন শেখর গুপ্ত। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একদিকে জামায়াতে ইসলামীর বাড়তে থাকা রাজনৈতিক প্রভাব এবং অন্যদিকে ভারত নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মনোভাব—দুই বিষয়ই বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করে নিয়মিত বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সমালোচনা করায় এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে ভারত নিয়ে যে মনোভাব তৈরি হয়েছে, তাতে নয়াদিল্লির সঙ্গে দ্রুত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেওয়া ঢাকার জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন বলেও মনে করেন তিনি।

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব

শেখর গুপ্তের মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ আরও কঠিন করে তুলছে। ঢাকার পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ তোলারও ভিত্তি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে একই কাতারে রাখা হবে কি না, তা সামনে আনেন শেখর গুপ্ত। তাঁর মতে, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশও সেই আলোচনায় যুক্ত হয়েছে।

এর ফলে ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম দুই সীমান্তেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দুটি দেশকে কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখানোর একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এমন পরিস্থিতি ভারতের জন্য উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে বলে মনে করেন শেখর গুপ্ত। তাঁর মতে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে একই বন্ধনীতে রাখলে এবং দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়লে তা নয়াদিল্লির কৌশলগত স্বার্থের জন্য সুবিধাজনক হবে না।

তিনি আরও বলেন, ভারতের দুই পাশে থাকা বড় প্রতিবেশী দেশগুলো যদি একই সময়ে বৈরী অবস্থান নেয় এবং পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়, তাহলে সেটি ভারতের জন্য কতটা লাভজনক, সেই প্রশ্ন বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ছোট পদক্ষেপে সম্পর্ক স্বাভাবিকের পরামর্শ

শেখর গুপ্তের মতে, ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে একই কৌশলগত পরিসরে চলে যাওয়া ঠেকানো। এ জন্য প্রতিবেশী নীতিকে দেশের মেরুকৃত অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ না করাই নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সম্পর্ক মেরামতের জন্য বড় কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ দিয়েই শুরু করতে হবে এমন নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, বাংলাদেশে ক্রিকেট সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণের মতো ছোট একটি পদক্ষেপ দিয়েও দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে।