বাংলাদেশসহ হিমালয় ও এর আশপাশের আটটি দেশের সামনে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চীন, আফগানিস্তান ও মিয়ানমার।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে এ সতর্কতার কথা জানানো হয়েছে। গত ২৬ আগস্ট নেপাল ও চীনের তিব্বতে হিমবাহ ধসে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর নতুন করে এ ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এসেছে।
আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের (আইসিআইএমওডি) তথ্য অনুযায়ী, হিমবাহ ধসের প্রভাব শুধু পাহাড়ি দেশগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকে না। পশ্চিমে আফগানিস্তান থেকে পূর্বে মিয়ানমার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত উজান ও ভাটি অঞ্চলেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
হিমবাহ গলনে বাড়ছে ঝুঁকি
আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা নেটওয়ার্ক ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের (ডব্লিউডব্লিউএ) প্রতিবেদনে সিস্টেমিকের সাম্প্রতিক গবেষণা এবং আইসিআইএমওডির ২০২৩ সালের প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, হিমালয়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন জমাট থাকা মাটি বা পারমাফ্রস্টও নরম হয়ে পড়েছে। এতে ভূমিধস, আকস্মিকভাবে হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ভেঙে যাওয়া এবং হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদীগুলোর পানি বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এসব ঘটনায় পুরো জনপদ প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এর ফলে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালা ঘিরে থাকা দেশগুলোর কোটি কোটি মানুষ একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে গবেষকরা আশঙ্কা করছেন।
সিস্টেমিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার হিমবাহ রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২১টি সক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এই অঞ্চল থেকে এশিয়ার ১০টি প্রধান নদী ব্যবস্থার উৎপত্তি হয়েছে। এগুলো হলো আমু দরিয়া, সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, ইরাবতী, সালউইন, মেকং, ইয়াংসি, হলুদ নদী ও তারিম।
এসব নদীর অববাহিকা ভাটি অঞ্চলের প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পানীয় জলের চাহিদা, জীবিকা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশেও রয়েছে সরাসরি ঝুঁকি
গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র—দুই নদী ব্যবস্থার উৎপত্তি হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে। ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের পর পদ্মা নামে পরিচিত। অন্যদিকে তিব্বতে উৎপন্ন ব্রহ্মপুত্র চীন ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে নদীটির প্রধান ধারা যমুনা নামে পরিচিত।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশসহ ভাটি অঞ্চলের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে গবেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সিস্টেমিকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শুধু ভারতের অংশেই প্রায় ২০০টি হিমবাহ হ্রদ যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ৫৬টি অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
সিস্টেমিকের সিনিয়র ডিরেক্টর ও প্রতিবেদনের প্রধান লেখক অরুশি চোপড়া মনে করেন, এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আবার ঘটবে কি না, সেটি মূল প্রশ্ন নয়; বরং কখন ঘটবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষজ্ঞরা পর্বত ও নদীগুলোর নজরদারি বাড়ানো, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় জোরদার, আগাম সতর্কবার্তার ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বন্যা ও ভূমিধসের মতো দুর্যোগে প্রাণহানি কিছুটা কমানো সম্ভব।
আরও পড়ুন:







