শনিবার

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৮ ভাদ্র, ১৪৩৩

হুথিদের অগ্রগতিতে সৌদি আরব ঘিরে বাড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭:১৬

শেয়ার

হুথিদের অগ্রগতিতে সৌদি আরব ঘিরে বাড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট
ছবি সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন করে জটিল হয়ে উঠছে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের দ্রুত অগ্রগতিতে। ১০ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর কৌশলগত কয়েকটি দ্বীপের দিকে এগিয়েছে হুথিরা। এতে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে ঘিরে তাদের প্রভাব আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হুথিদের এই অগ্রগতিতে ইয়েমেনের যুদ্ধের পাশাপাশি সৌদি আরবের নিরাপত্তা, তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় সৌদি আরব এখন লোহিত সাগরের নৌপথের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

মোখা দখল, হানিশ দ্বীপপুঞ্জের দিকে অগ্রসর

মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর লোহিত সাগরের উপকূল ধরে আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়েছে হুথি বাহিনী। তারা কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জেও পৌঁছেছে বলে ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্র দাবি করেছে।

এই অগ্রগতির ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুথিদের প্রভাব আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। লোহিত সাগরের সঙ্গে এডেন উপসাগর এবং পরবর্তী সময়ে ভারত মহাসাগরের যোগাযোগ তৈরি করে এই প্রণালি। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

হুথিদের এই অগ্রগতি এমন সময় ঘটেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান যুদ্ধ নভেম্বরের মধ্যবর্তী মার্কিন নির্বাচনের পর শেষ হতে পারে।

সৌদি তেল রপ্তানিতে বাড়ছে বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব

হুথিরা বাব আল-মান্দেবের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে ইরানের জন্য এটি বড় কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির মতো বাব আল-মান্দেবও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ। হরমুজ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হতো। যুদ্ধের কারণে সেই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৌদি আরবের জন্য লোহিত সাগরের রুট আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বাব আল-মান্দেব দিয়ে সৌদি আরবের সমুদ্রপথে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেড়েছে। ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী এমন পণ্যের মোট পরিবহনের প্রায় ৫ শতাংশ।

ফলে বাব আল-মান্দেবে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা আসতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাজারেও।

সৌদি জাহাজে হামলার হুমকি

হুথি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় কেন্দ্র জানিয়েছে, লোহিত সাগরে অন্যান্য নৌযানের চলাচল নিরাপদ থাকবে। তবে সৌদি আরবের জাহাজগুলো এই নিরাপত্তার আওতায় থাকবে না বলে জানানো হয়েছে।

এরই মধ্যে জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছিল হুথিরা। চলতি মাসে তারা হামলা আরও জোরদার করেছে।

হুথিদের হামলার মধ্যে সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতে ২৪ ঘণ্টায় চতুর্থবারের মতো জরুরি সতর্কতা জারি করেছে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ।

ইয়েমেন যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘের সতর্কতা

ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করে বলেছেন, ইয়েমেনের যুদ্ধ আরও নতুন ও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

মোখার নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের প্রবেশপথে তাদের সরাসরি উপস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জেনিফার নাইডহার্ট ডি অর্টিজ হুতিদের ইরানের এজেন্ট ও হাতিয়ার হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। তার দাবি, হুথিদের উত্তেজনা বৃদ্ধি গ্রহণযোগ্য নয় এবং যারা তাদের কর্মকাণ্ডে সহায়তা করছে, তাদের পরিণতির দায় নিতে হবে।

ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন মাত্রা

ইরান ও সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে। ইরান সরাসরি সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে ইয়েমেন, লেবানন ও ইরাকের মতো দেশে মিত্র ও সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে প্রভাব ধরে রেখেছে বলে মনে করা হয়।

হুথিদের সাধারণত ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধ অক্ষের অংশ হিসেবে দেখা হলেও তাদের নিজস্ব সংগঠন, স্বার্থ ও রাজনৈতিক লক্ষ্যও রয়েছে। ইয়েমেনের দীর্ঘ যুদ্ধে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি করেছে।

২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর সংঘাত বড় আকার নেয়। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। লক্ষ্য ছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা।

২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বড় ধরনের লড়াই বন্ধ হলেও এবার নতুন করে সংঘাত তীব্র হয়েছে। চলতি সপ্তাহে হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের তেল স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন।

হুথিদের অগ্রগতির প্রভাব তেলের বাজারে

হুথিদের অগ্রগতির খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি।

যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের জাতীয় গড় দামও প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে গ্যাসবাডি।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই নৌপথ হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব একই সময়ে সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

পাকিস্তানের সতর্কবার্তা, ইরানের অস্বীকার

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাকিস্তান ইরানকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়েছে বলে সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্র জানিয়েছে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে পাকিস্তান এই সতর্কবার্তা তেহরানের কাছে পৌঁছে দেয়।

তবে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান হুথিদের নিয়ন্ত্রণ করে না।

এদিকে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাম্প্রতিক মক্কা চুক্তিও পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্য দেশ হামলার শিকার হলে সেটিকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। এরই মধ্যে সৌদি আরবে পাকিস্তানের সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েনের খবরও এসেছে।

বাব আল-মান্দেবে প্রভাব বাড়লে বাড়বে সংকট

ইয়েমেন উপকূলে হুথিদের অগ্রগতি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় নৌপথে বড় ধরনের উত্তেজনা চলছে। হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি এখন বাব আল-মান্দাব ও লোহিত সাগরও সংঘাতের ঝুঁকিতে।

হুথিরা বাব আল-মান্দাবের ওপর প্রভাব বাড়াতে পারলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে তেলের দাম বাড়লে ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টাও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের অগ্রগতি এখন শুধু ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের বিষয়েই সীমাবদ্ধ নেই। এটি সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।