মঙ্গলবার

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭ ভাদ্র, ১৪৩৩

ঢাকার আস্থা ফেরাতে দিল্লিকে পরামর্শ ভারতের সাবেক জেনারেলের

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:৩৩

আপডেট: ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:৩৬

শেয়ার

ঢাকার আস্থা ফেরাতে দিল্লিকে পরামর্শ ভারতের সাবেক জেনারেলের
ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতিকে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন দেশটির সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল প্রকাশ চন্দ কাটোচ। তাঁর মতে, রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে অর্থনীতি, পানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়িয়ে ঢাকার সঙ্গে আস্থা পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।

সাউথ এশিয়া মনিটরে ২৯ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত ‘ডাউনটার্ন ইন ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ রিলেশনশিপস নিডস ডেফট হ্যান্ডলিং: ঢাকাস এলিয়েনেশন হ্যাজ সিকিউরিটি ফলআউটস ফর ইন্ডিয়া’ শীর্ষক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে এসব মতামত তুলে ধরেন প্রকাশ চন্দ কাটোচ।

নিবন্ধে তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে শেখ হাসিনা ইস্যু, পানি বণ্টন, বাংলাদেশের চীনমুখী কৌশল, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক বৃদ্ধি, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং বাণিজ্যিক বাধাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা ইস্যুতে বড় সংকট

নিবন্ধে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর তাঁর ভারতে অবস্থান এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যর্পণ দাবি দুই দেশের সম্পর্কে বড় সংকট তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাঁকে ফেরত চেয়েছে। অন্যদিকে ভারত বলছে, শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পদক্ষেপ তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত।

পানি বণ্টনেও দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা

তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকার বিষয়টিও নিবন্ধে গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষ দিকে শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এর নবায়ন আটকে গেলে দুই দেশের পানি ও কৃষি নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি হতে পারে।

এ অবস্থায় যৌথ নদী কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক নিয়মিত করা, তিস্তা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন ও তথ্যভিত্তিক চুক্তি এবং বন্যা ও নদীর পানি ছাড়ার বিষয়ে আগাম তথ্য বিনিময়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

চীনের সঙ্গে সহযোগিতা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ার বিষয়টিও ভারতীয় নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন কাটোচ। লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি পুনরুজ্জীবন ও তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততার পাশাপাশি বাংলাদেশের চীনা জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

পাশাপাশি পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধিকেও ভারতের পূর্ব সীমান্তে নতুন বহুমাত্রিক কৌশলগত পরিবেশ হিসেবে দেখেছেন তিনি। পাকিস্তানি সামরিক সক্ষমতা, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং চীনা সামরিক সরঞ্জামের সমন্বয়কে ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সীমান্ত ও বাণিজ্যেও আস্থা ফেরানোর সুযোগ

প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে অবৈধ পারাপার, চোরাচালান ও সীমান্ত সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক পুশ-ইন এবং সীমান্তে বিএসএফ-বিজিবির বিরোধও দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রতা, ট্রানজিট ফি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নন-ট্যারিফ বাধাকে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা হয়েছে। এসব বাধা কমিয়ে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সম্পর্ক মেরামতে যেসব উদ্যোগের পরামর্শ

নিবন্ধের শেষাংশে বিএসএফ-বিজিবির নিয়মিত স্থানীয় পর্যায়ের বৈঠক, সীমান্ত হাট বাড়ানো এবং বাণিজ্যের নন-ট্যারিফ বাধা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসা ও শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা এবং থিংকট্যাংক, সাংবাদিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ট্র্যাক-টু সংলাপ বাড়ানোর পরামর্শ রয়েছে।

প্রকাশ চন্দ কাটোচের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে অর্থনীতি, পানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে আস্থা পুনর্গঠন করাই ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে বেশি কার্যকর হতে পারে।

তবে নিবন্ধটি একজন অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় সেনা কর্মকর্তার বিশ্লেষণ ও ব্যক্তিগত মতামত। তাই চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এবং ভারতের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে তাঁর মূল্যায়নকে নিরপেক্ষ বা সর্বসম্মত তথ্য হিসেবে নয়, বরং ভারতীয় নিরাপত্তা-দৃষ্টিভঙ্গির একটি বিশ্লেষণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর