স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে নেপাল। আকস্মিক হিমবাহ ধসে ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর আশপাশের শহর-গ্রাম একসঙ্গে প্লাবিত হয়েছে। ঢলের সঙ্গে ভেসে আসা কাদা ও ধ্বংসস্তূপে ঢেকে গেছে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা। উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই মিলছে লাশ। এরই মধ্যে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭৫।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) নেপাল পুলিশের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সময়ের সঙ্গে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, ভয়াবহ এ বন্যায় ৯০০ জনেরও বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। সময় যত যাচ্ছে, জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশা ততই কমে আসছে। হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষের সন্ধান করছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া হাজারো মানুষের কাছে জরুরি খাবার ও অন্যান্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
উদ্ধারকারী দল কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরাতে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছে। কোথাও কোথাও প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়েও নিখোঁজদের সন্ধান চালানো হচ্ছে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে হঠাৎ নেপালের রাসুয়া জেলার দিকে ধেয়ে আসে আকস্মিক ঢল। হিমবাহ ধসের পর চীন ও নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত লেন্দে নদীতে কাদা ও ধ্বংসস্তূপ তীব্র গতিতে ছুটে গেলে এই বিপর্যয়ের শুরু হয়। বন্যার তীব্র স্রোত ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর আশপাশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে আঘাত হানে। ভেসে যায় ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র।
উদ্ধার অভিযান চলার সময় ওপর থেকে ধারণ করা ভিডিওতে বন্যার ভয়াবহতা ধরা পড়ে। একসময়ের প্রাণবন্ত গ্রামগুলোর ঘরবাড়ি এখন কাদায় মাখামাখি হয়ে আছে।
রেডক্রসের (আইএফআরসি) নেপাল প্রধান ডেভিড ফিশার জানান, এই বন্যায় কিছু গ্রাম ও ব্যস্ততম বাজার এলাকা পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে।
নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতের নাগরিক। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের পর্যটকও নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন।
এদিকে বন্যার পানি ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ নতুন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্যার পানিতে তৈরি হওয়া নতুন একটি হ্রদ ভেঙে আরও বড় বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যার ধ্বংসাবশেষ জমে ভোতেকোশি নদীর ওপর একটি অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হয়েছে। পানির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। হ্রদটির বাঁধ ভেঙে গেলে আবারও ভয়াবহ বন্যা হতে পারে।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালে হঠাৎ এমন একটি কৃত্রিম লেক তৈরি হয়েছে, যা উপচে পড়ে যে কোনো সময় নতুন আরেকটি ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করতে পারে।
চীনা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ প্রাকৃতিক বাধায় আটকে প্রতিবন্ধক হ্রদটি তৈরি হয়েছে। বাধটি ভেঙে গেলে আটকে থাকা বিপুল পানি একসঙ্গে নিচের দিকে নেমে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে নতুন আরেকটি ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।
নতুন সৃষ্ট কৃত্রিম লেকটি ইতোমধ্যে পানিতে ভরে গেছে। বৃহস্পতিবার সকালে লেকটিতে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছিল বলে হিসাব করেছে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। আগামী তিন দিনে এতে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে।
তিব্বতে উৎপত্তি হওয়া নেপালের ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে নতুন লেকটি তৈরি হয়েছে। এই লেকের ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে উল্লেখ করে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, সম্ভাব্য বন্যা হলে কী হতে পারে, সেটি নিরূপণ এবং জরুরি উদ্ধার অভিযানে সহায়তার বিষয়টি দেখা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হ্রদের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং আগামী ১ সেপ্টেম্বরের দিকে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
আরও পড়ুন:







