হিমালয় পর্বতমালায় কাদামাটি ও পাথরের বিশাল ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে প্রাণহানি ৩৯০ ছাড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ। গত বুধবার পাহাড়ের বিশাল একটি ধস নদীতে আছড়ে পড়লে এই ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। মুহূর্তেই পানির স্রোতে ভেসে যায় বিস্তীর্ণ উপত্যকা ও জনপদ।
নেপাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৩৯২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে সীমান্তবর্তী চীনের তিব্বত অঞ্চলে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্যোগের ভয়াবহতা বিবেচনায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি খিয়াং বৃহস্পতিবার তিব্বতের দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে উদ্ধারকাজের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
শত শত বিদেশি পর্যটক নিখোঁজ
নেপালের পর্যটন বিভাগ জানিয়েছে, ট্র্যাকিংয়ে গিয়ে অন্তত ৬৬৮ জন বিদেশি পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন। তারা ৩৪টি দেশের নাগরিক। নিখোঁজদের মধ্যে ভারতের ১৭৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৫ জন রয়েছেন।
বেইজিং জানিয়েছে, নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে ১০০ জন চীনা নাগরিকও রয়েছেন। এ ছাড়া তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ২৬০ জন বিদেশিসহ মোট ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, উদ্ধারকাজে বেগ
কাঠমান্ডু থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, রাস্তাঘাট ও সেতু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছানোই এখন উদ্ধারকারীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আহতদের অনেকের হাড় ভেঙে গেছে। অনেকে গুরুতর ক্ষতের শিকার হয়েছেন।
দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে আটকে পড়া হাজার হাজার মানুষের কাছে আকাশপথে খাদ্য ও জরুরি রসদ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নেপাল সেনাবাহিনীর ৫ হাজারেরও বেশি সদস্য উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন। বৈরী আবহাওয়া ও নদীর তীব্র স্রোতের মধ্যেও আপার ত্রিশূলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকা পড়া ৩৫০ জন শ্রমিক ও বাসিন্দাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
ব্যাপক অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতি
ভয়াবহ বন্যায় নেপালের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অন্তত ১৫টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৪৩১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
রাসুওয়ার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকি বলেন, নদীর পাশের পুরো জনপদ ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে। তাঁর নিজের পরিবারের পাঁচজন সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সহায়তা
দুর্যোগ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ৫০ লাখ ডলার জরুরি সহায়তা এবং একটি দুর্যোগ উপদেষ্টা দল পাঠাচ্ছে। জাতিসংঘ ২০ লাখ ডলার বরাদ্দ করেছে। এ ছাড়া কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াও আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। ভারত থেকে পাঠানো ত্রাণসামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে বিতরণ করা হচ্ছে।
শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ?
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে এই ধসের সৃষ্টি হয়েছে। তবে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ৪ দশমিক ৪ মাত্রার কম্পনটি মূলত বিশাল বরফ ও পাথরের স্তূপ ধসে পড়ার আঘাতেই সৃষ্টি হয়েছিল।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা ঘটনাটিকে জলবায়ু সংকটের সরাসরি আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, নেপালের মতো স্বল্পসম্পদের একটি দেশের পক্ষে একা এই সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বন্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন:







