ভারতে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে অন্তত ৪৪ মুসলমান নাগরিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯ জনের হত্যার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সংস্থার সংযোগ রয়েছে। অন্যদিকে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ জন। দক্ষিণ এশিয়ায় মানবাধিকার পরিস্থিতি তদারককারী সংগঠন সাউথ এশিয়ান জাস্টিস ক্যাম্পেইনের সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া টর্চার ট্র্যাকার’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত হত্যার পাশাপাশি ভারতীয় মুসলমানরা গ্রেপ্তার, বাড়িঘর ও ধর্মীয় স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং আবাসভূমি থেকে উচ্ছেদসহ বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, ভারতের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মুসলমান নাগরিকদের বিরুদ্ধে ‘পূর্ণমাত্রায় বলপ্রয়োগকারী উপকরণ’ ব্যবহার করছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে জুলাই পর্যন্ত তিন মাসে ভারতের আট রাজ্যে ২১টি পৃথক ঘটনায় মুসলমানদের এক হাজারের বেশি বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে চলতি বছর তিন হাজারের বেশি বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দুই মাসে ছয়টি রাজ্যে মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাহসহ ২৩টি ধর্মীয় স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত মাসে ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় ৪৮ ঘণ্টায় স্থানীয় ২ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ অঞ্চলে দুই পরিবারের বাড়ি বিস্ফোরক ব্যবহার করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
জুলাইয়ে ভারতজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময়ও মুসলমানদের বেছে বেছে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কলকাতায় বিক্ষোভে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া ১৪ জনের মধ্যে ১৩ জনই মুসলমান ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের প্রাদেশিক নির্বাচনে জয় লাভের পর অঞ্চলটি মুসলিমবিদ্বেষী তৎপরতার নতুন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সেখানে মসজিদ, মুসলমানদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মুসলিম ফেরিওয়ালাদের লক্ষ্য করে হামলা বেড়েছে। এর মধ্যে মসজিদে হামলার একটি ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যের সংখ্যালঘু কল্যাণ তহবিলের ৬২ শতাংশ অর্থ কর্তন করেছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে গরু জবাইয়ের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
আইন ও বিচার কাঠামোতেও মুসলমানদের অধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ভারতের আসাম ও মধ্যপ্রদেশে মুসলমানদের নিজস্ব পারিবারিক আইন বাতিল করে ‘অভিন্ন পারিবারিক আইন’ চালু করা হয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রদেশে ঐতিহাসিক কামাল মাওলা মসজিদকে প্রাদেশিক হাইকোর্ট হিন্দু মন্দির হিসেবে ঘোষণা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীদের সহিংসতার পুরোনো বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্তদের খালাস দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, চলতি বছর ভারতে ভোটার তালিকা থেকে ছয় কোটি মানুষকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই মুসলমান। পাশাপাশি বাংলাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে ভারত থেকে বহিষ্কারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, দুই বছরে ওই রাজ্য থেকে ১ হাজার ৬২৯ জন ‘বাংলাদেশি’কে বহিষ্কার করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:








