বৃহস্পতিবার

১৩ আগস্ট, ২০২৬ ২৯ শ্রাবণ, ১৪৩৩

দেশে মৃত্যুদণ্ড, বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়: শেখ হাসিনা ও আসাদের মধ্যে যত মিল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ১৮:৩৮

আপডেট: ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ১৮:৩৮

শেয়ার

দেশে মৃত্যুদণ্ড, বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়: শেখ হাসিনা ও আসাদের মধ্যে যত মিল
ছবি: সংগৃহীত

একসময় রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতা ছিল তাদের হাতে। সরকার, প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর ছিল শক্ত নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু সময় বদলেছে। দুজনেই এখন নিজ নিজ দেশের বাইরে। দেশে তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়া চলছে। আর তারা অবস্থান করছেন এমন দুটি দেশে, যারা তাদের প্রত্যর্পণের প্রশ্নে এখনো সাড়া দেয়নি।

একজন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যজন সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ। দুজনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নয়। দেশ দুটির ইতিহাস, সংঘাত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কও আলাদা। তবু ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাদের অবস্থানের মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য মিল দেখা যায়।

সবচেয়ে বড় মিলটি হলো, দুজনেই ক্ষমতা হারানোর পর বিদেশে আশ্রয় পেয়েছেন।

শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়েন এবং ভারতে অবস্থান নেন। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রায় বাশার আল-আসাদের দীর্ঘ শাসনের অবসান হয়। এরপর তিনি রাশিয়ায় আশ্রয় পান।

ক্ষমতার দীর্ঘ অধ্যায়ের পর আকস্মিক পতন

দুজনের ক্ষেত্রেই ক্ষমতার পতন ছিল নাটকীয়। শেখ হাসিনা দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান চরিত্র ছিলেন। তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ টানা ১৫ বছর সরকার পরিচালনা করে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলন দ্রুত বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালালে তার সরকারের পতন ঘটে।

আসাদের ক্ষেত্রে ঘটনাটি ছিল আরও দীর্ঘ সংঘাতের পরিণতি। ২০০০ সালে ক্ষমতায় আসা বাশার আল-আসাদের শাসন ২০১১ সালের গণআন্দোলনের পর গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। রাশিয়া ও ইরানের সহায়তায় তার সরকার দীর্ঘ সময় টিকে ছিল।

কিন্তু ২০২৪ সালের শেষ দিকে বিদ্রোহীদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ হারান আসাদ। তার পতনের মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের পাঁচ দশকের বেশি সময়ের শাসনের অবসান ঘটে।

ক্ষমতা হারানোর পর দুজনের বিরুদ্ধেই নিজ নিজ দেশে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ দেখা যায়।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলা হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এরপর বাংলাদেশ সরকার তাকে ভারত থেকে ফেরত চেয়ে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠিয়েছে।

ভারত এখনো হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। নয়াদিল্লি বলেছে, ঢাকার অনুরোধ আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জুলাইয়ে জানান, প্রত্যর্পণের অনুরোধটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে রয়েছে।

আসাদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষ তার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। তবে রাশিয়া তাকে সিরিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

গত ১১ আগস্ট সিরিয়ার একটি আদালত আসাদের অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। হত্যা, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এই রায় দেওয়া হয়। তবে তিনি রাশিয়ায় থাকায় ওই রায় বাস্তবায়নের সুযোগ নেই।

শেখ হাসিনা আশ্রয় নিয়েছেন ভারতে। ভারত ও তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক ছিল। তাই ক্ষমতাচ্যুতির পরও ভারত তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়নি।

আসাদের ক্ষেত্রে রাশিয়ার ভূমিকা ছিল আরও প্রত্যক্ষ। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় মস্কো ছিল তার সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমর্থকদের একটি। ২০১৫ সাল থেকে রুশ সামরিক সহায়তা আসাদ সরকারকে টিকে থাকতে বড় ভূমিকা রাখে। ক্ষমতার পতনের পর সেই রাশিয়াই তাকে আশ্রয় দেয়।

অর্থাৎ দুই ক্ষেত্রেই সাবেক শাসক এমন একটি দেশে অবস্থান করছেন, যার সঙ্গে তাদের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বা কৌশলগত সম্পর্ক ছিল।

তবে পার্থক্যও কম নয়

মিলের পাশাপাশি বড় পার্থক্যও রয়েছে।

শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন এমন সময়ে, যখন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক চালু রয়েছে এবং প্রত্যর্পণ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলছে।

বিপরীতে, সিরিয়ায় আসাদের পুরোনো রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং নতুন প্রশাসন তার বিরুদ্ধে জবাবদিহির উদ্যোগ নিয়েছে।

রাশিয়া ও সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের সম্পর্কও এখন আগের মতো নয়। তবু মস্কোর সঙ্গে দামেস্কের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা চলছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, আসাদের শাসন ছিল দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত। সিরিয়ায় সংঘাতের সময় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংঘাত ও ২০২৪ সালের আন্দোলনকে ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগই এখন বিচারপ্রক্রিয়ার কেন্দ্রে।

‘নিরাপদ আশ্রয়’ কতটা স্থায়ী?

শেখ হাসিনা ও আসাদের বর্তমান অবস্থাকে তাই সরলভাবে ‘নিরাপদ আশ্রয়’ বলা গেলেও এর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত নয়।

শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ভারত বলছে, তার প্রত্যর্পণের বিষয়টি আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচিত হবে। অর্থাৎ দিল্লি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেনি।

আসাদের ক্ষেত্রে রাশিয়ার আশ্রয় আরও স্পষ্ট। তবে সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে বিচার চালিয়ে যাচ্ছে। গত ১১ আগস্টের মৃত্যুদণ্ড সেই চাপকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

দুই সাবেক শাসকের গল্প তাই মোটামুটি একই জায়গায় এসে মেলে— ক্ষমতার শীর্ষ থেকে পতন, দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া, নিজ দেশে বিচার বা প্রত্যর্পণের দাবি, আর বিদেশে এমন এক রাষ্ট্রের আশ্রয়, যার সঙ্গে তাদের শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

তবে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ও বাশার-আল-আসাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে শুধু রাজনীতি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, কূটনৈতিক স্বার্থ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।



banner close
banner close