পাহাড়, মরুভূমি আর আরব সাগরের উপকূলঘেঁষা পাকিস্তানের সবচেয়ে অস্থির ও বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তান। ভূগর্ভে থাকা বিপুল পরিমাণ গ্যাস, তামা, সোনা ও বিরল খনিজ সম্পদ এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণেই অঞ্চলটি এখন বিশ্বশক্তির লড়াইয়ের কেন্দ্রে।
চীনের কাছে এটি কেবল উন্নয়ন নয়, বরং তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর বা সিপেকের প্রাণকেন্দ্র। গোয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দর, মহাসড়ক, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও খনিজ প্রকল্পের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারত মহাসাগরে কৌশলগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে চায় বেইজিং। অন্যদিকে, অঞ্চলটির খনিজ সম্পদ ও ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নিবিড় নজর রাখছে যুক্তরাষ্ট্র; যা বেলুচিস্তানকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এক জটিল ক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
বিদেশি বিনিয়োগ যত বাড়ছে, ততই ঘনীভূত হচ্ছে নিরাপত্তা সংকট। গত কয়েক বছরে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় চীনা প্রকৌশলী, নির্মাণকর্মী এবং সিপেক প্রকল্পকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলার ঘটনা পাকিস্তানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ স্পষ্ট জানিয়েছেন, দেশে অবস্থানরত চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, কারণ এই বিনিয়োগ দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।
তবে হামলার দায় স্বীকার করে বেলুচ লিবারেশন আর্মি বা বিএলএর দাবি, গ্যাস, তেল, তামা ও সোনার মতো স্থানীয় সম্পদের সুবিধা নিচ্ছে ইসলামাবাদ ও বিদেশি কোম্পানিগুলো, আর দারিদ্র্য ও বৈষম্যের শিকার স্থানীয় জনগণের কাছে চীনা প্রকল্পগুলো উন্নয়নের বদলে বাইরের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতীক।
এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক বিবৃতিতে বেলুচিস্তান প্রজাতন্ত্র নামে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পাশাপাশি নিজস্ব জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, মুদ্রা ও প্রশাসনিক কাঠামো চালুর দাবি করা হয়েছে। তবে, কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা নির্ভরযোগ্য স্বাধীন সূত্র এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি এবং পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়া হয়নি।
এদিকে, বেলুচ নেতা মীর ইয়ার বেলুচ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ প্রতিরোধে যোগ দেয়ায় বেলুচিস্তান কার্যত তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক মাধ্যমের এই প্রচার এবং আফগান সীমান্তঘেঁষা নিরাপত্তা ঝুঁকি ভারত-পাকিস্তানের আঞ্চলিক রাজনীতিকে নতুন করে প্রভাবিত করছে।
বেলুচ বিদ্রোহে ভারতের সমর্থন রয়েছে বলে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে এলেও, আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইযোগ্য প্রকাশ্য প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি। ভারতও তা অস্বীকার করে উল্টো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থনের পাল্টা অভিযোগ তোলে। তবে, জিও নিউজের নয়া পাকিস্তান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ দাবি করেছেন, বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি কেবল আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক বা সন্ত্রাসবাদের সমস্যা নয়, বরং আফগানিস্তানকে প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করে ভারতের চাপিয়ে দেয়া একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ।
পাকিস্তান সরকার সর্বোচ্চ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ভারতের ষড়যন্ত্রের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট ও সংগ্রহীত প্রমাণ শিগগিরই আন্তর্জাতিক ফোরামে উপস্থাপন করা হবে।
বেলুচিস্তানের চলমান এই অস্থিরতাকে কেবল অভ্যন্তরীণ বঞ্চনা হিসেবে দেখতে নারাজ বিশ্লেষকরা। পাকিস্তানি ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক আয়েশা গাজীর মতে, বেলুচিস্তানে বর্তমানে যা ঘটছে, তা ১৯৭০-এর দশকের পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতির হুবহু প্রতিরূপ। পূর্ব পাকিস্তানে মানুষের বঞ্চনাবোধকে পুঁজি করে যে সফল স্ক্রিপ্ট বা ছক ব্যবহার করা হয়েছিল, ভারত বেলুচিস্তানেও ঠিক একই কৌশলে মানুষের ক্ষোভকে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত করছে।
১৯৪৭ সাল থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই অর্থনৈতিক বঞ্চনার পেছনের আসল দায় কার? সেই প্রশ্ন সামনে এনেছেন আয়শা সিদ্দিকী। তার মতে, গত ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে বেলুচিস্তানের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার, সরদার ও মূলধারার রাজনীতিকদের অন্ধ আনুগত্যই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। সাধারণ মানুষ শিক্ষিত ও সচেতন হলে সরদারদের ভোটব্যাংক ও নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হবে। এই ভয় থেকেই স্থানীয় নেতারা উন্নয়নে বাধা দেয় এবং পরবর্তীতে নিজেদের ব্যর্থতার দায় রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেয়। ফলে অন্ধ পক্ষপাতের কারণে বিএলএকে সমর্থন করা মানুষের সংখ্যা বেলুচিস্তানের ভেতরে খুব বেশি না হলেও, বাইরে থেকে তাদের সমর্থন জোগানো হচ্ছে। আর সন্ত্রাসবাদ ছাড়া মাঠপর্যায়ে বাস্তব কোনো অর্জনই করতে পারেনি এই অপশক্তি।
যারা বর্তমানে মানবাধিকার, অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও শিক্ষার অধিকার নিয়ে প্রচার চালাচ্ছে, তারা কখনোই নিজেদের সরদার বা প্রাদেশিক পরিষদের সামনে কোনো লংমার্চ করেনি। অথচ পাকিস্তান রাষ্ট্র তাদের বেলুচিস্তান থেকে ইসলামাবাদ পর্যন্ত লংমার্চ করার এবং দিনের পর দিন অবস্থান করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক আয়েশা গাজীর মতে, রাষ্ট্র যদি সত্যিই সব কণ্ঠ দমন করত, তবে বিশ্বজুড়ে ডা. মাহরাং বালোচের এই পরিচিতি ও আন্তর্জাতিক কভারেজ পাওয়া সম্ভব হতো না।
প্রচলিত সশস্ত্র যুদ্ধ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে ব্যর্থ হওয়ায় শত্রু শক্তিগুলো এখন সামরিক, তথ্য, সাইবার, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের সমন্বিত হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার এবং পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ বা ফিফথ জেনারেশন ওয়ারফেয়ার এর আশ্রয় নিয়েছে। সরকারি মহলের দাবি, ডা. মাহরাং বালোচ ও তার সংগঠন বালোচ ইয়কজেহতি কমিটি বা বিওয়াইসি মানবাধিকার ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের একতরফা প্রচারণার আড়ালে রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল করতে কাজ করছে।
নিরাপত্তা সংস্থার প্রমাণ অনুযায়ী, তাদের দেয়া গুমের তালিকার বড় অংশই নিষিদ্ধ বিএলএর প্রশিক্ষণ শিবিরে থাকা অথবা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত জঙ্গি। বিএলএর হাতে নিহত পাঞ্জাবি ও সিন্ধি শ্রমিক, ফ্রন্টিয়ার কর্পস বা এফসি সদস্য এবং দেশপ্রেমিক বালোচ নেতাদের হত্যার বিষয়ে মাহরাং বালোচের নীরবতা, তাকে সশস্ত্র জঙ্গিদের রাজনৈতিক ফ্রন্টম্যান হিসেবে চিহ্নিত করছে।
হাইব্রিড যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে কোয়েটায়। নিষিদ্ধ ঘোষিত বিএলএ কর্তৃক কোয়েটা থেকে পেশোয়ারগামী যাত্রীবাহী ট্রেন জাফর এক্সপ্রেস হাইজ্যাক ও রেললাইন বিস্ফোরণের পর নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে একাধিক বিপজ্জনক সন্ত্রাসী নিহত হয়। ময়নাতদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার জন্য এসব মরদেহ কোয়েটার সিভিল হাসপাতালের মর্গে নেয়া হলে, মাহরাং বালোচের নেতৃত্বে বিওয়াইসির প্রায় দেড়শ উত্তেজিত কর্মী হাসপাতালে হামলা চালিয়ে কর্মীদের জিম্মি করে মর্গের দরজা ভেঙে পাঁচ সন্ত্রাসীর লাশ জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়।
এরপর কোয়েটার সারিয়াব রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ জলকামান ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করলে, ধর্নায় উপস্থিত সশস্ত্র মুখোশধারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর গুলি চালিয়ে দায় রাষ্ট্রের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে, মার্চ ২০১০ সালের গ্রেপ্তারের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জুনে কোয়েটার সন্ত্রাসবিরোধী আদালত ডা. মাহরাং বালোচ ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের হাসপাতালে হামলা, লাশ ছিনতাই এবং বিদ্রোহে উসকানি দেয়ার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে।
তদন্তে দেখা গেছে, গোয়াদরে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদল ও চীনা বিনিয়োগকারীদের আগমন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সিপেক চুক্তি স্বাক্ষরের দিনগুলোতেই ইচ্ছাকৃতভাবে মাহরাং বালোচের প্রতিবাদ কর্মসূচি ও ধর্মঘট ডাকা হতো, যাতে বিশ্বে বার্তা যায় যে বেলুচিস্তান বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ নয়।
স্থানীয় চাঁদার বাইরে গিয়ে তার এই আন্দোলন বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থায় ব্যাপক কাভারেজ পায়। সরকার এটি, পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করার আন্তর্জাতিক লবির অংশ হিসেবে দেখছে। যার পেছনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র এবং পশ্চিমে অবস্থানরত পাকিস্তানবিরোধী উপাদানগুলোর অর্থায়নে, এক্সসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী ট্রেন্ড চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
সংবিধান সকল প্রদেশকে সমান অধিকার দিলেও, তরুণদের মধ্যে প্রাদেশিক ঘৃণা ছড়িয়ে ফেডারেল সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীকে দখলদার হিসেবে উপস্থাপন করে শিক্ষার্থীদের অস্ত্র ধরতে উসকানি দেয়ার অভিযোগও রয়েছে মাহরাং বালোচের বিরুদ্ধে।
রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সম্মান জানানো হবে, কিন্তু অধিকারের নামে সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা, সিপেকবিরোধী ষড়যন্ত্র এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যেকোনো অপতৎপরতা আইনের পূর্ণ শক্তিতে দমন করা হবে বলেও জানানো হয় পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে।
আয়েশা গাজীর তথ্যমতে, এই বিদ্রোহ পুরোপুরি বাইরের মদদপুষ্ট। পূর্ব পাকিস্তানের মতোই ইসরায়েল প্রকাশ্যে তাদের থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলোতে বেলুচিস্তানের নামে নতুন অধ্যায় খুলছে এবং ভারতীয় মিডিয়া পাকিস্তানি সন্ত্রাসীদের প্ল্যাটফর্ম দিচ্ছে। আফগানিস্তান সীমান্ত থেকে ভারতের প্রক্সি হিসেবে টিটিপি এবং ইরান সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীর কর্মরত গুপ্তচর কুলভূষণ যাদবের মাধ্যমে পরিচালিত বিএলএ নেটওয়ার্ক সবই একই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ।
টিটিপি নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক আয়েশা গাজীর এই তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় জনপ্রিয় অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের সাম্প্রতিক একটি ভিডিও বার্তার। তার দাবি, অর্থের বিনিময়ে পাকিস্তানে পরিকল্পিত অস্থিরতা সৃষ্টি করা টিটিপি মূলত ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র এর একটি প্রজেক্ট। টিটিপির মতোই সন্ত্রাসবাদকে ইন্ধন জোগাতে বেলুচিস্তানে নিজেদের সহযোগীদের সক্রিয় করেছে ভারতের র।
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে বরাবরই, আলোচনায় এসেছে সশস্ত্র গোষ্ঠী বেলুচ লিবারেশন আর্মি বা বিএলএ। সম্প্রতি সংগঠনটির বিরুদ্ধে নারীদের অপহরণ, উগ্রবাদে প্ররোচণা এবং সহিংস কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করার গুরুতর অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। ভুক্তভোগীদের বিবরণে বেরিয়ে এসেছে সংগঠনের ভেতরের ভয়াবহ ও অমানবিক চিত্র। আদর্শিক কারণের চেয়ে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে এবং টাকার বিনিময়ে নতুন সদস্য যুক্ত করারও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বিএলএর সদস্যরা সাধারণ নারীদের জোরপূর্বক অপহরণ করে তাদের গোপন ক্যাম্পে নিয়ে যেত। সেখানে বন্দি নারীদের আইসের মতো ভয়ানক মাদক সেবনের জন্য বাধ্য করা হতো, যাতে তাদের মানসিক ভারসাম্য ও প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। এ বিষয়ে এক ভুক্তভোগী নারীর চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি প্রকাশ্যে এসেছে।
মূলত বিএলএ একটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন, যা দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান পরিচালনা করে আসছে এবং পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত।
তবে, সাম্প্রতিক বিতর্ক রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার চেয়ে বেশি কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছে নারী সদস্যদের ভূমিকা এবং তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে। অভিযোগ উঠেছে, বিএলএ এবং তাদের ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তরুণ-তরুণীদের, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করছে, যা অনেক ক্ষেত্রে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ, কিছু নারীকে জোরপূর্বক বা প্রতারণার মাধ্যমে সংগঠনে যুক্ত করা হয়। পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত পরিবারের বক্তব্যেও নিখোঁজ মেয়েদের সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার দাবি করা হয়েছে।
বেলুচিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক। একদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তীব্র বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান।
এমনকি বিএলএ সংগঠনের সদস্য দল থেকে অনেকেই বের হয়ে যাওয়ার পর, তুলে ধরছে সংগঠটির নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।
বিএলএ সংগঠনের সন্ত্রাসীরা বেলুচিস্তানের বিভিন্ন জায়গাতে হামলা, লুটতরাজের কারণে প্রদেশেটির সাধারণ মানুষই আতঙ্কিত।
বেলুচিস্তানের সাধারণ মানুষ, বিএলএর আহ্বানের বিপরীতে গিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের নীতিকে স্বাগত জানাচ্ছে এবং বেলুচিস্তানের প্রতীক বা পতাকা প্রত্যাখ্যান করছে ইতোমধ্যেই।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল আলোচনা-সমালোচনা তিনটি বিষয়কে ঘিরে, নারী সদস্যরা স্বেচ্ছায় যোগ দিচ্ছে নাকি বাধ্য হচ্ছে, রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে নারীদের ঝুঁকিপূর্ণ ও সহিংস কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, এবং নিখোঁজ ব্যক্তি ও মানবাধিকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি দাবির সত্যতা কতটুকু? প্রশ্ন উঠেছে এ নিয়েও। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো নারীকে জোরপূর্বক বা মানসিক চাপে ব্যবহার করা হলে, সেটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ হিসেবে বিবেচিত হবে।
পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে বেলুচিস্তানের জন্য আলাদা বরাদ্দ রয়েছে প্রতি বছরে। সরকারি স্কুল, স্বাস্থ্য সেবাসহ বিভিন্ন সুবিধার পাশাপাশি সেখানকার নিজস্ব রাজনীতি ও সংস্কৃতিতেও পাকিস্তান সরকার হস্তক্ষেপ করে না।
বর্তমান তথ্য-প্রমাণ অনুযায়ী পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার পথে না থাকলেও, বেলুচিস্তান এখন দেশটির সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঞ্চল। এই বিদ্রোহ, চীনের বিশাল বিনিয়োগ, স্থানীয় অসন্তোষ এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান আগ্রহ, সব মিলিয়ে এই সংকট কেবল একটি প্রদেশের ভবিষ্যৎ নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, জ্বালানি রাজনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
আরও পড়ুন:








