শুক্রবার

৩১ জুলাই, ২০২৬ ১৬ শ্রাবণ, ১৪৩৩

সেমিকন্ডাক্টরে চীনের উত্থানে বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩১ জুলাই, ২০২৬ ১৯:৪৭

শেয়ার

সেমিকন্ডাক্টরে চীনের উত্থানে বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ
ছবি সংগৃহীত

দীর্ঘদিন ধরে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর প্রাধান্য থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে চীনের ধারাবাহিক অগ্রগতি বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তিতে উন্নত লিথোগ্রাফি মেশিন উৎপাদন এবং চিপ নির্মাণে সাফল্য সেমিকন্ডাক্টর খাতে নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানায়, চীন প্রথমবারের মতো নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ইমার্শন ডিপ আল্ট্রাভায়োলেট (ডিইউভি) লিথোগ্রাফি মেশিনের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সাংহাই আইশেংনা ইলেকট্রনিক টেকনোলজি গ্রুপ এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি চীনের বিভিন্ন লিথোগ্রাফি কোম্পানির প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে এ প্রযুক্তি উন্নয়ন করেছে।

এদিকে, চীনের গবেষকরা দাবি করেছেন, তারা নিজস্ব এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট (ইইউভি) লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি উন্নয়নেরও দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন। তাদের এ দাবি সফল হলে, এটি গত কয়েক দশকের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বর্তমানে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের জন্য লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিইউভি প্রযুক্তি ব্যবহার করে দক্ষ প্রকৌশল কৌশলের মাধ্যমে ৭ ন্যানোমিটার পর্যন্ত চিপ তৈরি সম্ভব হলেও, ২, ৩ ও ৫ ন্যানোমিটারের অত্যাধুনিক প্রসেসর তৈরির জন্য ইইউভি প্রযুক্তি প্রায় অপরিহার্য।

এই উন্নত প্রযুক্তির বাণিজ্যিক বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই নেদারল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠান এএসএমএলের কার্যত একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে। তাদের তৈরি ইইউভি মেশিন বিশ্বের সবচেয়ে জটিল শিল্পযন্ত্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলেও চীনের কাছে উন্নত চিপ, চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি এবং সফটওয়্যার রপ্তানিতে একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর ফলে হুয়াওয়ে ও সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনের (এসএমআইসি) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত বিদেশি প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার হারায়।

তবে এসব নিষেধাজ্ঞার পর চীন সেমিকন্ডাক্টর খাতকে জাতীয় কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে। গবেষণা, উৎপাদন, যন্ত্রপাতি, উপকরণ এবং জনবল তৈরিতে দেশটি কয়েক দশক ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী জিনা রাইমন্ডোর চীন সফরের সময় হুয়াওয়ে তাদের ‘মেট ৬০ প্রো’ স্মার্টফোন উন্মোচন করে। পরে বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফোনটিতে ব্যবহৃত ৭ ন্যানোমিটার প্রসেসরটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান এসএমআইসি তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল এমন একটি সাফল্য, যা অনেকের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে। কারণ নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনের পক্ষে এমন চিপ তৈরি করা সম্ভব হবে না বলেই ধারণা করা হয়েছিল।

চীনের লক্ষ্য শুধু একটি বা দুটি সফল চিপ কোম্পানি তৈরি করা নয়; বরং একটি সম্পূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। চিপ ডিজাইন, উৎপাদন যন্ত্রপাতি, উপকরণ, মেমোরি চিপ এবং ফ্যাব্রিকেশনসহ সব খাতেই সমান্তরালভাবে বিনিয়োগ করছে দেশটি।

এরই মধ্যে চ্যাংজিন মেমরি টেকনোলজিস (সিএক্সএমটি) দ্রুত বিশ্বের অন্যতম বড় ডিআরএএম মেমোরি চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি ইয়াংজি মেমরি টেকনোলজিস (ওয়াইএমটিসি) উন্নত এনএএনডি ফ্ল্যাশ মেমোরি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে।

চীন যদি ভবিষ্যতে নিজস্ব লিথোগ্রাফি প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে, তবে বিশ্বের অন্যতম বড় বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে এএসএমএল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপ্লায়েড ম্যাটেরিয়ালস, ল্যাম রিসার্চ এবং কেএলএর মতো চিপ উৎপাদন সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতে পারে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের মতো মেমোরি চিপ নির্মাতারাও চীনের অগ্রগতিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্প দুটি পৃথক প্রযুক্তিগত ইকোসিস্টেমে বিভক্ত হতে পারে। একটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নেতৃত্বে, অন্যটি চীনকে কেন্দ্র করে। তবে এখনও উন্নত চিপ ডিজাইনে যুক্তরাষ্ট্র, অত্যাধুনিক চিপ উৎপাদনে তাইওয়ানের টিএসএমসি এবং ইইউভি প্রযুক্তিতে এএসএমএল বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখনো বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর দৌড়ে শীর্ষে পৌঁছায়নি। তবে সাম্প্রতিক অগ্রগতি দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে একটি দেশের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদে থামিয়ে রাখা কঠিন। ফলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাবের পাশাপাশি এখন চীনের উত্থানও বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।

সূত্র: এনডিটিভি



banner close
banner close