মাত্র কয়েকদিন আগেই ভারতের রাজপথে দেখা গিয়েছিল এক ভিন্ন ছবি। ধর্ম নয়, অধিকারের প্রশ্নে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিলো হিন্দু-মুসলিম একসাথে। যন্তর-মন্তরের সেই আন্দোলনে হাজারো হিন্দু শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মুসলিম স্বেচ্ছাসেবীরা। কেউ দিয়েছেন খাবার, কেউ চিকিৎসা, কেউ খুলে দিয়েছেন মসজিদের দরজা।
পুলিশের লাঠিচার্জে যখন আন্দোলনকারীরা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিলেন, তখন বহু আন্দোলনকারীর অভিযোগ, কাছের একটি মন্দিরের ফটক বন্ধ করে দেয়া হয়। বিপরীতে স্থানীয় একটি মসজিদ আশ্রয় দেয় ক্লান্ত ও আতঙ্কিত তরুণদের। সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত প্রতীক হয়ে ওঠে।
খাবার, পানি, ওষুধ, ধর্মের পরিচয় না দেখে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেয় মুসলিম স্বেচ্ছাসেবীরা। আন্দোলনের নেতৃত্বেও প্রকাশ্যে বলা হয়, এই সহযোগিতা না থাকলে দীর্ঘদিনের অবস্থান কর্মসূচি টিকিয়ে রাখা আরও কঠিন হতো।
সেই আন্দোলনের চাপেই শেষ পর্যন্ত ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। অনেকের কাছে এটি ছিল নাগরিক ঐক্যের বিরল এক দৃষ্টান্ত।
জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮ ভবন ভাঙার নির্দেশ
কিন্তু আন্দোলনের সেই আবহ পুরোপুরি কাটতে না কাটতেই উত্তরপ্রদেশ থেকে এলো নতুন এক খবর। প্রবল জুলাইয়ের তাপপ্রবাহ উপেক্ষা করে চটে মাদুর পেতে দিনের পর দিন অবস্থান করছেন শতাধিক মানুষ। কারও হাতে জাতীয় পতাকা, কারও মুখে প্রতিবাদের স্লোগান। তাদের দাবি, বাঁচিয়ে রাখতে হবে মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা মোহাম্মদ আলী জওহরের নামে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি গড়ে তোলেন প্রখ্যাত মুসলিম রাজনীতিক আজম খান। ২০০৩ সালে গঠিত মোহাম্মদ আলী জওহর ট্রাস্টের উদ্যোগে কয়েক বছর পর যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু বুধবার (১৫ জুলাই) রামপুর জেলা প্রশাসন এক নির্দেশনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টি ভবনের মধ্যে ৩৮টি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়।
প্রশাসনের দাবি, অধিকাংশ ভবন নির্মাণে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। কেবল একটি প্রস্তাবিত মেডিকেল কলেজ ব্লকসহ দুটি স্থাপনা বৈধ অনুমোদন নিয়ে নির্মিত হয়েছে। তাই, আগামী বুধবার (৫ আগস্ট) এর মধ্যে বাকি ভবনগুলো অপসারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছে শিক্ষার্থী, সাবেক ছাত্রছাত্রী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এমন সিদ্ধান্ত হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেবে। এছাড়া, বর্তমান বিজেপি সরকারের ভোটের রাজনীতিতে, মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে দেয়া এক ধরনের কৌশল বলে অভিযোগ তাদের।
কয়েকদিন আগেও, ভারতের রাজপথে ধর্মীয় বিভাজন ভুলে যে মুসলিম সম্প্রদায় আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল, সেই স্মৃতি এখনও আলোচনায়। আর ঠিক সেই সময়েই একটি মুসলিম ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ভবন ভেঙে দেয়ার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
সমর্থকদের মতে, এটি কেবল অবকাঠামোর প্রশ্ন নয়; একটি ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতের প্রশ্নও। অন্যদিকে প্রশাসনের অবস্থান, এটি সম্পূর্ণভাবে নির্মাণবিধি ও আইনি অনুমোদনের বিষয়।
একদিকে যন্তর-মন্তরে ধর্মের দেয়াল ভেঙে গড়ে ওঠা মানবিক সংহতির বার্তা, অন্যদিকে উত্তরপ্রদেশে মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে উচ্ছেদ বিতর্ক। এই দুই ঘটনাই এখন ভারতের শিক্ষা, প্রশাসন এবং সামাজিক সহাবস্থান নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন:








