বুধবার

২৯ জুলাই, ২০২৬ ১৪ শ্রাবণ, ১৪৩৩

মুসলিমদের জন্যই সফল হলো ভারতের আন্দোলন!

নিউজ ডেস্ক: বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬ ২২:৪৬

শেয়ার

মুসলিমদের জন্যই সফল হলো ভারতের আন্দোলন!
ছবি সংগৃহীত

নির্যাতিত মুসলিমরাই ভারতীয় হিন্দু তরুণদের ত্রাতা। ককরোচ পার্টির আন্দোলন। মুসলমানদের ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হিন্দু আন্দোলনকারীরা; প্রশংসার জোয়ার।

ভারতে পরিচয় আলাদা হলেও, আজ স্বপ্ন একটাই। দীর্ঘদিনের কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিভাজনের দেয়াল ভেঙে রাজপথে রচিত হয়েছে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির এক অনন্য ইতিহাস।

একসময় যে ভারতে মুসলিমদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনে পুলিশও সঙ্গ দিত, দাড়ি-টুপি দেখলেই হেনস্তার শিকার হতে হতো কিংবা জোর করে জয় শ্রীরাম বলানোর মতো অমানবিক অভিযোগ উঠতো। আজ সেই দেশের ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দিল্লির যন্তর-মন্তরে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হাজার হাজার তরুণ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্লোগান দিয়েছে একই মঞ্চে। পুলিশের সামনেই বন্দে মাতরমের পাশাপাশি রাজপথে এখন একযোগে ধ্বনিত হচ্ছে ইনকিলাব জিন্দাবাদ এবং নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার স্লোগান।

ধর্মের দেয়াল ভেঙে একতা

ভারতীয়দের আজ একটাই উপলব্ধি, মুসলিমরা তাদের পর কেউ না। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে সরকার এতোদিন যে ধর্মের দেয়াল তুলে রেখেছিল, তা আজ ধূলিসাৎ। ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের স্পষ্ট বার্তা, ধর্ম নিয়ে আর কোনো বিভেদের রাজনীতি মেনে নেয়া হবে না, যেকোনো অন্যায়ের প্রতিরোধ গড়তে তারা এখন একতাবদ্ধ।

ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে সবসময় মুসলমানদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন ভারতীয়রা। তারা আরও স্পষ্ট জানিয়েছে, বিভাজনের রাজনীতি বা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মূল এজেন্ডা আর কোনোভাবেই বাস্তবায়ন হতে দেয়া হবে না।

বিপদে মন্দির বন্ধ, মসজিদে আশ্রয়

ভ্রাতৃত্বের এই বন্ধন কতটা গভীর, তার বড় প্রমাণ মেলে আন্দোলনের এক কঠিন মুহূর্তে। নয়াদিল্লিসহ দেশজুড়ে টানা ৩৬ দিন ধরে চলা শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলন দমাতে একপর্যায়ে চরম আগ্রাসী হয়ে ওঠে পুলিশ প্রশাসন।

শুরু হয় বেধড়ক লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ। পুলিশের হামলা থেকে বাঁচতে আন্দোলনরত অসংখ্য তরুণ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে যায় তাদের মন্দিরে। কিন্তু মন্দিরের পুরোহিতরা আশ্রয় দেয়ার বদলে ভেতর থেকে আটকে দেয় প্রধান ফটক। দেবতার ঘরের দরজা মানুষের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার এই দৃশ্য স্তব্ধ করে দেয় আন্দোলনকারীদের।

ঠিক সেই বিপদের সময় আশ্রয়ে টেনে নেয় মসজিদ কর্তৃপক্ষ। শুধু নিরাপদ আশ্রয়ই নয়, ক্লান্ত-বিধ্বস্ত এই তরুণদের পানি ও খাবার সহায়তা করেন স্থানীয় মুসলিমরা।

বুকভরা ক্ষোভ আর হতাশায় হিন্দু তরুণরা কসম কেটে প্রতিজ্ঞা করে, আর কোনোদিন মন্দিরে পা রাখবে না। যে দেবতার আরাধনা তারা সারাজীবন করে আসছে, তাঁর দরজা বিপদে বন্ধ দেখে স্তব্ধ হয়ে যায় তারা।

মানবতার দৃষ্টান্ত

আন্দোলনের এই দীর্ঘ সময়ে মানবতার এক বিরল দৃষ্টান্ত দেখেছে ভারতবাসী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আন্দোলনরত ক্লান্ত শিক্ষার্থীরা ঘুমাচ্ছে, আর পরম শান্তিতে যেন ঘুমাতে পারে, তাই এক মুসলিম তাকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন।

এছাড়া দিল্লির যন্তর-মন্তরে আন্দোলন চলাকালে ভারতীয় মুসলিম এবং বিভিন্ন শিখ ধর্মীয় ফাউন্ডেশন ও স্বেচ্ছাসেবীরা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের মাঝে খাবার, খিচুড়ি, ফলের রস ও ওষুধ বিতরণ করে। পুলিশের লাঠিচার্জে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিতেও শিক্ষার্থীরা একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে।

আন্দোলনের সূচনা ও সফলতা

মূলত, ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে ৩ দফা দাবিতে এই আন্দোলনের সূচনা। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্য এবং নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে অভিজিৎ দীপক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি গঠন করেন, যা পরবর্তীতে দেশের অন্যতম বড় নাগরিক ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিভাজনে পা না দিয়ে শুধুমাত্র শিক্ষার অধিকার ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে একতাবদ্ধ হয়। সিজেপি-র সভাপতি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ভারতীয় মুসলিম নাগরিক মোহাম্মাদ জুনাইদ না থাকলে যন্তর-মন্তরের এই টানা অবস্থান ও আন্দোলন কখনোই সফল হতো না।

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ গৃহিণী ও অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের নিয়ে এসে জেন-জি প্রজন্মের এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানায়। বিপদের দিনে যারা ধর্ম দেখেনি, সেই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে হিন্দু তরুণরা।

অবশেষে, সর্বস্তরের মানুষের এই নজিরবিহীন সর্বজনীন ঐক্যের মুখে পড়ে শনিবার (২৫ জুলাই) ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। দিল্লির যন্তর-মন্তর প্রমাণ করেছে দেশের যুবসমাজ যখন সাধারণ স্বার্থে একজোট হয়, তখন ধর্মীয় বা সামাজিক প্রাচীরগুলো ভেঙে এক অভূতপূর্ব মানবিক ও গণতান্ত্রিক ঐক্যের সৃষ্টি হয়।



banner close
banner close