দীর্ঘদিন ধরেই উন্নত চিকিৎসার আশায় বাংলাদেশি রোগী ও তাদের স্বজনদের কাছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত এক নির্ভরতার নাম হিসেবেই বিবেচিত হয়ে এসেছে। জীবনের মায়া আর সুস্থতার প্রত্যাশা বুকে নিয়ে প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষ পাড়ি জমিয়েছে সেই পথে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা সেই আস্থার ভিত্তিকেই যেন নতুন করে নাড়িয়ে দিচ্ছে। চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এখন বাংলাদেশিদের কাছে হয়ে উঠছে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন, এক নতুন উদ্বেগের নাম।
বেঙ্গালুরুর ঘটনায় নতুন উদ্বেগ
সম্প্রতি ভারতের প্রযুক্তিনগরী বেঙ্গালুরুতে ঘটে যাওয়া এক আশঙ্কাজনক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই উদ্বেগ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, কেবল বাংলাদেশি সন্দেহে রাস্তা আটকে এক দম্পতিকে গালিগালাজ, শারীরিক নির্যাতন এবং নারীকে লাঞ্ছনার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে এক স্থানীয় চিকিৎসক।
জানা যায়, ঘটনার শিকার ২৩ বছর বয়সী নাসরিনা ও তার স্বামী মোহাম্মদ বিলাল দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বেঙ্গালুরুতেই বসবাস করে আসছে। স্থানীয় কানাড়া ভাষায় নিজেদের পরিচয় স্পষ্ট করার পরও তাদের বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, কিল, ঘুষি ও লাথি মারার অভিযোগ রয়েছে ডক্টর নাগেন্দ্রপ্পার বিরুদ্ধে। এমনকি থানায় অভিযোগ করলে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করে তারা। পরবর্তীতে এ ঘটনায় বেঙ্গালুরু পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলেও, পরদিনই জামিনে মুক্ত হয়ে যান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও
অপরদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতেও দেখা যায়, কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সন্ত্রাসীরা নিজেদের দেশের মানুষকেই বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে বেধড়ক পেটাচ্ছে।
সীমান্ত হত্যা ও তিস্তা ইস্যু
বাংলাদেশিদের প্রতি ভারতীয়দের এই আক্রোশ আরও অনেকভাবেই প্রমাণিত হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে বাংলাদেশিদের প্রাণহানির বিষয় সামনে আসছে। বছর বছর এই ইস্যুতে আলোচনা হলেও কার্যকর সমাধান বা জবাবদিহিতার জায়গা স্পষ্ট করা তো দূরের কথা, ভারত এই সীমান্ত হত্যার বিষয়কে পাত্তাই দিচ্ছে না বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।
পাশাপাশি তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়েও বারবার তৈরি হয়েছে নানা উত্তেজনা। শুকনো মৌসুমে পানি আটকে রেখে অঞ্চলকে মরুভূমির শুষ্কতায় ঠেলে দেওয়া, আর বর্ষায় হঠাৎ করেই পানি ছেড়ে দিয়ে প্লাবনের বিস্তারে ভাসিয়ে দেওয়া, এই দ্বিমুখী বাস্তবতা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনকে করে তুলেছে চরম দুর্বিষহ।
রাজনৈতিক বক্তব্য ও বিকল্প গন্তব্যের আলোচনা
অন্যদিকে, ভারতের কিছু রাজনৈতিক মহল থেকেও সময়ে অসময়ে বাংলাদেশকে ঘিরে তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ বক্তব্য শোনা যায়। কখনো হুমকি, কখনো অবজ্ঞা, আবার কখনো বাংলাদেশ দখলে নেওয়ার হুঙ্কার। যার প্রতিধ্বনি দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ককেই শুধু অস্বস্তির এক নতুন সমীকরণে দাঁড় করায় বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে চিকিৎসা মানবজীবনের এক গভীর আস্থার নাম, আরোগ্যের এক নীরব প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সেই আশ্রয়ের পথেই যদি অনিশ্চয়তার অন্ধকার ছায়া নেমে আসে, তবে তা শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলে না, মানবিকতার ভিতকেও নাড়িয়ে দেয়। ফলে, নিরাপত্তার কারণে চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশিদের ভারতের পরিবর্তে বিকল্প গন্তব্য বেছে নেওয়ার পরামর্শই এখন জোরালো হয়ে উঠছে নানা মহলে।
আরও পড়ুন:








