শনিবার

১৮ জুলাই, ২০২৬ ৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩

তাজমহলকে মন্দির দাবিতে নতুন বিতর্ক

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬ ১৩:৩৫

শেয়ার

তাজমহলকে মন্দির দাবিতে নতুন বিতর্ক
ছবি সংগৃহীত

ভারতের ঐতিহাসিক স্থাপনা তাজমহলকে ঘিরে আবারও বিতর্ক শুরু হয়েছে। উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদের এক বিজেপি নেতা আদালতে দাবি করেছেন, তাজমহলের স্থানে আগে একটি মন্দির ছিল এবং তার প্রমাণ এখনো তাজমহলের বেসমেন্টে রয়েছে। এ দাবির ভিত্তিতে তিনি তাজমহলে জরিপ চালানোর আবেদন করেন। জেলা আদালত আবেদনটি খারিজ করে দিলে তিনি এলাহাবাদ হাইকোর্টে যান। পরে হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই)-কে নোটিস দিয়ে এ বিষয়ে তাদের অবস্থান জানতে চেয়েছে।

তবে ইতিহাসবিদদের মতে, তাজমহলকে ঘিরে এ ধরনের দাবির পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। ইতিহাসবিদ ড. রুচিকা শর্মা বলেছেন, ১৯৬৫ সালের আগে তাজমহল নিয়ে কোনো বিতর্কের নজির পাওয়া যায় না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাজমহল নির্মাণসংক্রান্ত সব গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষিত রয়েছে।

তাজমহলের নির্মাণ ইতিহাস

ইতিহাসবিদদের মতে, ১৬৩১ সালে বুরহানপুরে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজ মহলের মৃত্যু হলে তার স্মৃতিতে একটি সমাধিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। এ জন্য আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে রাজা জয় সিংয়ের মালিকানাধীন একটি স্থান নির্বাচন করা হয়।

ইতিহাসবিদ আব্দুল হামিদ লাহোরি তার গ্রন্থ বাদশাহনামায় উল্লেখ করেছেন, স্মৃতিসৌধটির নির্মাণকাজ ভিত্তি স্থাপনের মাধ্যমে শুরু হয়। ১৬৪৮ সালের মধ্যে মূল স্থাপনার নির্মাণ শেষ হলেও খোদাই এবং উদ্যানের খালের কাজ সম্পন্ন করতে আরও প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগে।

ড. রুচিকা শর্মা জানিয়েছেন, রাজা জয় সিং বিনা মূল্যে জমি দিতে চাইলেও শাহজাহান তা গ্রহণ করেননি। পরিবর্তে সমমূল্যের অন্য একটি জমি তাকে দেওয়া হয়েছিল। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে।

প্রচলিত গল্প ও ইতিহাসের অবস্থান

তাজমহলকে ঘিরে বিভিন্ন প্রচলিত গল্প রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, তাজমহল নির্মাণের পর কারিগরদের হাত কেটে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা আর এমন স্থাপনা নির্মাণ করতে না পারেন। ড. রুচিকা শর্মা বলেন, এ দাবির পক্ষে কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।

আরেকটি প্রচলিত দাবিতে বলা হয়, তাজমহল নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে গুজরাটে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল এবং এতে হিন্দুরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে ড. শর্মার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তা মোকাবিলায় শাহজাহান প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন এবং খাদ্যশস্যসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করেছিলেন। তার মতে, দুর্ভিক্ষে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

পিএন ওকের তত্ত্ব ও বিতর্কের সূত্রপাত

ভারতীয় লেখক পুরুষোত্তম নাগেশ ওক (পিএন ওক) ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত দ্য তাজমহল ওয়াজ আ রাজপুত প্যালেস বইয়ে দাবি করেন, তাজমহল মূলত একটি রাজপুত প্রাসাদ ছিল, যা পরে শাহজাহান তাজমহলে রূপান্তর করেন।

পরবর্তী সময়ে তাজমহল: দ্য ট্রু স্টোরি বইয়ে তিনি দাবি করেন, এটি দ্বাদশ শতাব্দীতে নির্মিত একটি শিবমন্দির ছিল, যা পরে সমাধিসৌধে রূপান্তর করা হয়। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, তাজমহলের স্থাপত্যশৈলী, গম্বুজ, পাথরের কারুকাজ, তৈমুরি ও পারস্য নির্মাণরীতি স্পষ্টভাবে মুঘল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বহন করে। ড. রুচিকা শর্মা জানান, পিএন ওক ইতিহাসবিদ ছিলেন না; তিনি পেশায় আইনজীবী এবং সাংবাদিক ছিলেন।

তিনি আরও জানান, পিএন ওক ২০০০ সালে এ দাবির পক্ষে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন। তবে আদালত তাৎক্ষণিকভাবে আবেদনটি খারিজ করে দেয়।

এএসআই ও ইতিহাসবিদদের অবস্থান

ড. রুচিকা শর্মার মতে, পিএন ওকের দাবিগুলোকে ইতিহাস নয়, কল্পনা হিসেবেই দেখা উচিত। তিনি জানান, ২০০৫ সালেও এলাহাবাদ হাইকোর্টে একই ধরনের একটি আবেদন করা হয়েছিল। সেবারও ঐতিহাসিক প্রমাণের অভাবে আদালত আবেদনটি খারিজ করে দেন।

২০১৭ সালে এএসআই এক বিবৃতিতে জানায়, তাজমহলের স্থানে আগে কোনো মন্দির ছিল বা ভবনটি কখনো মন্দির হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, এমন কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই।

বেসমেন্টের ২২টি কক্ষ নিয়ে দাবি

সাম্প্রতিক আবেদনে তাজমহলের বেসমেন্টের ২২টি কক্ষ খুলে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। ড. রুচিকা শর্মা বলেন, ওই অংশে শুধু মমতাজ মহল ও শাহজাহান নন, রাজপরিবারের আরও সদস্যদের সমাধি রয়েছে।

তার মতে, কক্ষগুলো খুলে দিলে জলীয় বাষ্পের প্রভাবে তাজমহলের ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, ওই কক্ষগুলোতে কোনো মন্দিরের অবশিষ্টাংশ নেই এবং সেখানে সমাধিস্থ ব্যক্তিদের দেহাবশেষ ছাড়া অন্য কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

কেন বারবার এমন দাবি

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ইসলামি স্থাপত্যগুলো আসলে পূর্ববর্তী হিন্দু স্থাপনা ছিল বলে যে দাবি করা হয়, তা একটি বৃহত্তর মতাদর্শিক প্রচারের অংশ। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে মুসলিম শাসনামলকে হিন্দুদের পরাজয় ও দখলের ইতিহাস হিসেবে তুলে ধরা হয়।

ড. রুচিকা শর্মার মতে, পিএন ওকের তেজো মহালয়া তত্ত্বও সেই ধারারই অংশ। তার অভিযোগ, শব্দের ব্যাখ্যা নিয়ে নানা ধরনের ব্যুৎপত্তিগত যুক্তি দাঁড় করিয়ে পিএন ওক এসব তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন, যা ইতিহাসসম্মত নয়।

উপাসনালয় সুরক্ষা আইন

ভারতের প্লেস অব ওরশিপ (স্পেশাল প্রভিশন) অ্যাক্ট, ১৯৯১ অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় যে ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর যে অবস্থান ছিল, তা অপরিবর্তিত রাখার বিধান রয়েছে।

ড. রুচিকা শর্মার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মামলার মাধ্যমে এ আইনের মূল উদ্দেশ্য প্রশ্নের মুখে পড়ছে। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আগের সিদ্ধান্ত এবং এএসআইয়ের ব্যাখ্যা থাকা সত্ত্বেও একই ধরনের দাবি নতুন করে আদালতে উত্থাপনের যৌক্তিকতা স্পষ্ট নয়।

তাজমহলকে ঘিরে বিতর্ক চললেও এটি এখনো বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র এবং ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

সূত্র: বিবিসি বাংলা



banner close
banner close