মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ইসরায়েলকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের প্রস্তাবে ১০০ জনের বেশি ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা সমর্থন জানিয়েছেন। যদিও শেষ পর্যন্ত সংশোধনীটি ৩১৪-১০৪ ভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তবে এই ভোটকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে ইসরায়েল ইস্যুতে ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার স্থানীয় সময় রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসি উত্থাপিত সংশোধনীর পক্ষে ১০৩ জন ডেমোক্র্যাট এবং একজন রিপাবলিকান সদস্য ভোট দেন। বিপক্ষে ভোট দেন ৯৮ জন ডেমোক্র্যাট। এছাড়া ১০ জন সদস্য ‘প্রেজেন্ট’ ভোট দেন, অর্থাৎ তাঁরা পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো অবস্থান নেননি। খবর বিবিসির।
হাউসে ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়েও এ ইস্যুতে মতভেদ দেখা যায়। হাউস মাইনরিটি লিডার হাকিম জেফরিজ ও ডেমোক্র্যাটিক ককাসের চেয়ারম্যান পিট আগুইলার সংশোধনীর বিপক্ষে ভোট দিলেও, হাউস ডেমোক্র্যাটিক হুইপ ক্যাথরিন ক্লার্ক এর পক্ষে ভোট দেন।
প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটরা এই ভোটকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের দাবি, এই প্রথম হাউসে সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সদস্য ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। দুই বছর আগে একই ধরনের প্রস্তাবে মাত্র ৩৭ জন ডেমোক্র্যাট সমর্থন জানিয়েছিলেন।
ভোটের পর কংগ্রেশনাল প্রগ্রেসিভ ককাসের চেয়ারম্যান গ্রেগ ক্যাসার বলেন, এখন থেকে হাউসের সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সদস্য ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর জন্য বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তার পক্ষে ভোট দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, এটি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য একটি শক্ত বার্তা এবং এই ভোটের পর বিষয়টি আর আগের অবস্থায় থাকবে না।
ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ইলহান ওমর বলেন, কংগ্রেসের একমাত্র ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সদস্য রাশিদা তালিবের সঙ্গে তিনি ভোটের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তাঁর মতে, কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার সময় এমন একটি ভোটের কথা কল্পনাও করা যায়নি।
ভোটের আগে ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্ব সদস্যদের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক ‘হুইপ’ জারি করেনি। বরং হাকিম জেফরিজ সবাইকে নিজ নিজ বিবেক অনুযায়ী ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দলটির সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকও করেন।
ক্যাথরিন ক্লার্কের মতো কয়েকজন ডেমোক্র্যাট, যারা সংশোধনীর পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের মতে প্রস্তাবটিতে গুরুতর ত্রুটি ছিল। কারণ এতে গাজায় ফিলিস্তিনি শরণার্থী ও বেসামরিক মানুষের জন্য মানবিক সহায়তার অর্থায়নও বন্ধ হয়ে যেত। আবার অনেকের ধারণা, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতেই রিপাবলিকানরা এই সংশোধনী এনেছিল।
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ক্লার্ক বলেন, এটি ইসরায়েলকে দেওয়া আক্রমণাত্মক সামরিক সহায়তা নিয়ে প্রয়োজনীয় বিতর্কের আন্তরিক উদ্যোগ নয়; বরং রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক কৌশল। তবে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আর টেকসই নয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের আইন, স্বার্থ ও মূল্যবোধ অনুসরণ না করা কোনো দেশকে সীমাহীন ও জবাবদিহিহীন সামরিক সহায়তা দেওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে সংশোধনীর বিপক্ষে ভোট দেওয়া ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি মার্ক পোকান বলেন, প্রস্তাবটির পাস হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না, তবু এটি দলকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল পরিস্থিতিতে ফেলেছে। তবে তিনি সদস্যদের বিবেক অনুযায়ী ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য হাকিম জেফরিজের প্রশংসা করেন।
‘প্রেজেন্ট’ ভোট দেওয়া প্রতিনিধি জ্যারেড হাফম্যান বলেন, ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। তাঁর মতে, ম্যাসির সংশোধনী সেই বার্তা প্রকাশের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংশোধনীটি পাস না হলেও এই ভোট ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে ইসরায়েল-সংক্রান্ত নীতিতে পরিবর্তনের দাবির শক্তিশালী প্রতিফলন এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে।
আরও পড়ুন:








