মঙ্গলবার

৩০ জুন, ২০২৬ ১৬ আষাঢ়, ১৪৩৩

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়াদের কল্যাণ সুবিধা বন্ধের শঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুন, ২০২৬ ১৯:১৯

শেয়ার

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়াদের কল্যাণ সুবিধা বন্ধের শঙ্কা
ছবি সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (এসআইআর) কার্যক্রমে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার জানিয়েছে, তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিরা খাদ্য রেশনসহ বিভিন্ন সরকারি কল্যাণমূলক কর্মসূচির সুবিধা পাবেন না।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভোটার তালিকার সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির যোগসূত্র স্থাপন সাংবিধানিক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন মৃত, দ্বৈত বা সন্দেহভাজন ভোটার শনাক্ত করার লক্ষ্যে দেশজুড়ে এসআইআর কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গে এই উদ্যোগকে কেন্দ্রীয় সরকার অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী শনাক্তের প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরলেও বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মুসলিম অধ্যুষিত ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে তুলনামূলক বেশি সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়েছে।

রাজ্য সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের ৪ জুনের নির্দেশনা অনুযায়ী, এসআইআরে বাদ পড়া ব্যক্তিদের রেশন কার্ড নিষ্ক্রিয় চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে যারা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আপিল করেছেন, তাদের মধ্যে প্রায় ২৩ লাখ মানুষ আপাতত রেশনসহ সংশ্লিষ্ট সুবিধা পেতে থাকবেন বলে সরকার পরে জানিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের পরিচয় যাচাইও শুরু হয়েছে।

মুর্শিদাবাদের দিনমজুর অন্তু শেখ জানিয়েছেন, তিনি ট্রাইব্যুনালে আপিল করলেও তাকে অতিরিক্ত নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। জীবিকার প্রয়োজনে অন্য রাজ্যে কাজে যেতে হওয়ায় দীর্ঘদিন এলাকায় থেকে শুনানির অপেক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব নয় বলে তিনি জানান। ভবিষ্যতে পরিবারের খাদ্য রেশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাকিনা বানোর আবেদন ট্রাইব্যুনাল খারিজ করে দিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তার স্বামী হৃদরোগে আক্রান্ত এবং আগের সরকারি সহায়তায় ব্যয়বহুল চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়েছিল বলে তিনি জানান। এখন রেশন ও অন্যান্য সরকারি সহায়তা হারানোর শঙ্কায় পরিবারটি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। নারীদের জন্য চালু হওয়া আর্থিক সহায়তা কর্মসূচিও পুনরায় যাচাইয়ের আওতায় এনে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

হুগলি জেলার দুই সরকারি বিদ্যালয়কর্মী ইমতিয়াজ আহমেদ ও তার ভাইও ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন বলে জানা গেছে। যথাযথ শুনানি ছাড়াই তাদের আপিল নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন। এখন তাদের রেশন-সংক্রান্ত নথি জমা দিয়ে নতুন করে বিস্তৃত তথ্য সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। সব নথি জমা দেওয়ার পরও সরকারি সুবিধা হারাতে হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।

পশ্চিমবঙ্গের কৃষিশ্রমিক সংগঠন পশ্চিমবঙ্গ ক্ষেত মজুর সমিতি সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে দাবি করেছে, এ সিদ্ধান্তের ফলে ৩৫ থেকে ৬০ লাখ মানুষের রেশন কার্ড অকার্যকর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে সর্বোচ্চ আদালত জরুরি শুনানির আবেদন গ্রহণ না করে কলকাতা হাইকোর্টে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

আইনজীবী ও অধিকারকর্মী সঞ্জয় হেগড়ে বলেছেন, ভোটার তালিকায় নাম না থাকাকে সরকারি কল্যাণমূলক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। এটি সংবিধানের সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির ঝুঁকিপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অর্থনীতিবিদ জ্যঁ দ্রেজ এসআইআরকে ত্রুটিপূর্ণ ও কর্তৃত্ববাদী উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, ভোটার তালিকায় ভুলবশত বাদ পড়া মানুষের ওপর একই ভুলের প্রভাব খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচিতেও চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়। বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সাগরিকা ঘোষও এই পদক্ষেপকে অমানবিক ও সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন।

অনেক আবেদনকারী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ট্রাইব্যুনালে আপিল করলেও তাদের নাম আদৌ ভোটার তালিকায় পুনর্বহাল হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লেও তাতে নাগরিকত্ব বা মৌলিক সরকারি সুবিধা পাওয়ার অধিকার বিলুপ্ত হয়ে যায় না বলে তাদের বক্তব্য।

সূত্র: আলজাজিরা



banner close
banner close